আবু লাহাবের হাত দুটি এবং ওনারা দুজন প্রসঙ্গে ।

” — ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হাতদুটি এবং ধ্বংস হোক সে — ” ।
সুরা – মাসাদ (লাহাব) / ০১ ।

প্রিয় পাঠক ,
পবিত্র কোরআনের এটা ১১১ তম সুরা ।
মহান আল্লাহর প্রতিটি কথাতেই শিক্ষনীয় কিছু থাকবেই থাকবে ।
সঙ্গত কারনেই আপনার বাড়তি মনযোগ চাইছি , প্লীজ ।

এই সুরাটিতে মহান আল্লাহ আবু লাহাবের দুইটি হাতের ধ্বংস চাইলেন কেন ?
এখানে তো আবু লাহাবের পা , চোখ , কান ইত্যাদির ধ্বংস চাইতে পারতেন । আবু লাহাবের শরীরের অন্য অঙ্গগুলির ধ্বংস না চেয়ে শুধুমাত্র হাত দুটির ধ্বংস কেন চাওয়া হচ্ছে ?
নিশ্চয়ই এর পেছনে কোন না কোন কারন আছে !
শরীরের এত অঙ্গ থাকতে শুধু হাতদুটির ধ্বংস চাওয়া হচ্ছে কেন ?

আসুন ,
একটু বিশ্লেষন করি – কি সেই নেপথ্য কারন ।
মহান আল্লাহর সরাসরি হুকুমে রাসুলের (সাঃ) আশ্রয়দাতা , লালন পালনকর্তা প্রানপ্রিয় চাচা হযরত ইমরান ওরফে আবু তালিবের (আঃ) আর্থিক সহায়তা ও প্রতক্ষ্য তত্বাবধানে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্মের প্রচারের জন্য হযরত আবু তালিবের (আঃ) গৃহে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হইল ।
এই অনুষ্ঠানেই আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্মের প্রকাশ্য দাওয়াত দেওয়া হইল । এবং হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মহান আল্লাহ প্রেরিত একজন রাসুল – সে ঘোষনা দেওয়া হইল ।
মক্কা নগরীর সকল গোত্রপতি ও সকল নেতা উপনেতাসহ মান্যগন্য সকলকেই নিমন্ত্রন করা হয়েছিল । পর পর তিনদিন সে অনুষ্ঠান চলে । সাথে ভুড়িভোজের আয়োজনও ছিল ।
ইতিহাসে সে অনুষ্ঠানটি “দাওয়াতে জুল আশিরা” নামে সুপরিচিত ।

যাইহোক , অনুষ্ঠানে ভরপুর খাওয়া দাওয়া শেষে রাসুল (সাঃ) আমন্ত্রিত সকল অতিথিগনের উদ্দেশ্যে বক্তৃতার এক পর্যায় নিজেকে মহান আল্লাহ কতৃক প্রেরিত একজন রাসুল হিসাবে উপস্থাপন করলেন ।
এই ঘোষনা শোনামাত্র ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাসুলের (সাঃ) চাচা জনাব আবু লাহাব তার দুই হাত উঁচু করে ঐ ঘোষনার তীব্র প্রতিবাদ করা শুরু করে দিল ।
আবু লাহাবের দুই হাত উঁচু করে তীব্র চীৎকার ও মারমুখি আচরনের প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানে বেশ হট্টগোল শুরু হল ।
এমতাবস্থায় অনুষ্ঠানের শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার স্বার্থে বাঘের মত গর্জে উঠলেন রাসুলের (সাঃ) সার্বক্ষনিক নিরাপত্তাদাতা হযরত ইমরান ওরফে আবু তালিব (আঃ) ।

বজ্র কঠিন ভাষায় আবু লাহাবকে প্রচন্ড হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন , “ওহে লাহাব ! হাতদুটি নামিয়ে চুপ করে বসে পড় ও আমার ভাতিজা মুহাম্মাদের কথা শুনে যাও এবং তোর ঐ হাতদুটি যেন ধ্বংস হয়ে যাক –” ইত্যাদি ইত্যাদি ।
মহান আল্লাহ সাথে সাথে হযরত আবু তালিবের (আঃ) এই প্রার্থনা কবুল করলেন । এবং কেয়ামত পর্যন্ত আবু লাহাবের প্রতি অভিশাপ ও লানত প্রদান অব্যাহত রাখলেন ।

এছাড়া আবু লাহাবের হাত দুটি ধ্বংসের আরও কারন আছে ।
মহানবী (সাঃ) যখনই কোন কাজে বাহিরে বেরুতেন তখনই সময় সুযোগমত লাহাব তার দুই হাত দিয়ে মহানবীর (সাঃ) প্রতি সজোরে ছোট ছোট পাথরখন্ড নিক্ষেপ করত যাতে করে নবীজী (সাঃ) মারাত্মক ভাবে আহত হয় । একবার তো নামাজে সেজদারত অবস্থায় রাসুলের (সাঃ) পবিত্র মাথার উপর উটের নাঁড়িভূঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে নবীজীকে (সাঃ) দমবন্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল ।
এসব জঘন্য অপকর্মগুলো লাহাব তার দুই হাত দিয়েই সম্পাদন করত ।

পাঠক ,
গভীর মনযোগ সহকারে খেয়াল করুন যে , আবু লাহাব কিন্ত মহান আল্লাহর সরাসরি বিরোধীতা করে নাই । প্রচন্ড বিরোধীতা করেছিল রাসুলের (সাঃ) প্রতি । বিরোধীতা সত্বেও হযরত আবু তালিবের (আঃ) তীব্র নজরদারির ফলে মহানবীকে (সাঃ) হত্যা করার মত দুঃসাহস করে নাই আবু লাহাব ।
আবু লাহাব ছিল রাসুলের (সাঃ) খুবই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সম্পর্কে চাচা ।

পাঠক ,
এবারে মূল কথায় আসি – দয়া করে আমায় বুঝিয়ে বলবেন কি !
রাসুলের (সাঃ) ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং সম্পর্কে আপন চাচা হয়েও জনাব আবু লাহাব মহান আল্লাহর তীব্র ক্রোধ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারল না ।
পক্ষান্তরে ,
রাসুলের (সাঃ) কোন আত্মীয় কুটুম নন । রাসুলের (সাঃ) বংশের বাহিরের লোক যারা নিজেদের কন্যাকে রাসুলের (সাঃ) ঘরে দিয়ে আত্মীয় হলেন বটে !
রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর এই জাতীয় আত্মীয়বর্গ রাসুলের (সাঃ) পবিত্র “নাফসের” বৈধ পৈত্রিক সম্পত্তি বাগে ফাদাক অবৈধ দখল , পবিত্র গৃহে অগ্নিসংযোগ , দুই পা দিয়ে জ্বলন্ত দরজাতে সজোরে লাথি দিয়ে হত্যা করার পরেও কি করে ওনারা “রাঃআনহু খেতাবপ্রাপ্ত আশারা মোবাশশরার” অন্তর্ভুক্ত হইলেন ?
আসলেই হিসাব মেলে না !

বোধকরি আমার মত গর্দভ উম্মতের জন্যে মহান আল্লাহ এই দুটি আয়াত নাজিল করেছেন ।
” — তোমাদের কি হয়েছে , তোমরা কেমন বিচার করছ ? তবে কি তোমরা চিন্তা ভাবনা কর না — ” ?
সুরা – সাফফাত / ১৫৪ , ১৫৫ ।

” — নিঃসন্দেহে আমরা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি জ্বীন ও মানুষের মধ্যে অনেককে , তাদের অন্তর আছে যার মাধ্যমে তারা বোঝে না , তাদের চোখ আছে যার মাধ্যমে তারা দেখে না , তাদের কান আছে যার মাধ্যমে তারা শোনে না , তারা গবাদি পশুর মত , বরং তারা আরও পথভ্রষ্ট , তারাই হল যারা কর্নপাত করে না — ” ।
সুরা – আরাফ / ১৭৯ ।

আজ আর নয় ।
সকলকে সালাম জানিয়ে আজকের মত বিদায় ।
খোদা-হাফেজ ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + sixteen =