আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য শোক পালনের দর্শন ।

মজলুম ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য ক্রন্দন ও শোক পালনের দর্শন ।

কিছু প্রশ্ন –

কেন আমরা আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য শোকে মাতম করিব ? তাঁরা কি আমাদের শোক ক্রন্দন পালনের মুখাপেক্ষী ?

কেন আমরা অতীতের ঘটনাসমূহের স্মরন করিব ?

বাস্তবতা –

ওহাবী সম্প্রদায় এরূপ কর্মকে “বিদআত” এবং “হারাম” বলে থাকে ।

এবং বার ইমামীয়া শীয়াদেরকে এরূপ কর্মের জন্য সমালোচনা ও প্রচন্ড নিন্দা করে ।

সূত্র – ইবনে তাইমিয়া , মিনহাজুস সুন্নাহ ,১ম খন্ড ,পৃ. ৫২-৫৫ ।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা —

এখানে উপরে উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়ার চেষ্টা করব ।

প্রথমে আজাদারী বা শোক পালনের দলীলসমূহ উপস্থাপন করছি ।

১) –

শোক পালন ভালবাসা ও ঘৃণার প্রকাশ ।

ভালবাসা ও বিদ্বেষ – এ দুটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে রয়েছে ।

এ দুটি বিষয় কারোও প্রতি আকর্ষন ও কারোও প্রতি বিকর্ষনের আত্মিক রূপ ।

যাদের প্রতি ভালবাসা , শ্রদ্বা ও সম্মান পোষন করা অপরিহার্য ।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনাগত (কোরআন ও হাদীসভিত্তিক) দলীলের ভিত্তিতে কারোও কারোও প্রতি ভালবাসা পোষন করা অপরিহার্য ।

যেমন :

ক) –

আল্লাহ :

মহান আল্লাহ যেহেতু সকল পূর্ণতার গুণাবলীতে গুণান্বিত ও সকল ত্রুটি হতে মুক্ত এবং সকল সৃষ্টি তাঁর উপর সত্তাগতভাবে নির্ভরশীল । তাই তাঁর প্রতি ভালবাসা প্রকৃতিগত । ধর্মীয় নির্দেশেও তাঁর প্রতি ভালবাসা পোষণের ইঙ্গিত রয়েছে ।

যেমন পবিত্র কোরআনে এসেছে –

“ —- বল , তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা , তোমাদের সন্তান , তোমাদের ভাই , তোমাদের স্ত্রী , তোমাদের বংশ ও গোত্র , তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ , তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান – যাকে তোমরা পছন্দ কর – আল্লাহ , তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয় , তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত । আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না —। ”

সূরা – তাওবাহ / ২৪ ।

খ)-

আল্লাহর রাসূল ( সাঃ) :

অপর যাঁকে আল্লাহর কারনে আমাদেরকে অবশ্যই ভালবাসতে হবে তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) । কারণ তিনি হলেন মহান আল্লাহর অস্তিত্বগত (তাকভীনি) ও বিধানগত (তাশরীয়ি) উভয় রহমত অবতীর্ণের মাধ্যম ।

এ কারণেই উক্ত আয়াতে আল্লাহর পাশাপাশি তাঁর নাম এসেছে এবং তাঁর প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য সরাসরি নির্দেশ দেয়া হয়েছে ।

মহানবী (সাঃ) বলেছেন –

‘ আল্লাহকে এ জন্য ভালবাস যে , তিনি তোমাদের জীবিকা দেন এবং আমাকে আল্লাহর কারনেই ভালবাস ।’

সূত্র – মুস্তাদরাকে হাকিম , ৩য় খন্ড ,পৃ. ১৯৪ ।

অন্যদিকে মহানবীর (সাঃ) মধ্যে যে পূর্ণতামূলক গুণাবলী ছিল তার কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হইত এবং তাঁর প্রতি ভালবাসা তাদের হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল ।

গ) –

মহানবীর ( সাঃ) পুতঃপবিত্র রক্তজ বংশধর –

রাসূলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র রক্তজ বংশধরদের প্রতি ভালবাসা পোষন করাও অপরিহার্য । কারণ তাঁরা উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী ও পূর্ণতার গুণসম্পন্ন হওয়া ছাড়াও মহান আল্লাহর সকল আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত নিয়ামতের মাধ্যম হলেন তাঁরা । এ কারণেই রাসূল (সাঃ) তাঁদেরকে অনসরন , আনুগত্য এবং ভালবাসার নির্দেশ দিয়েছেন ।

মহানবী (সাঃ) পূর্বোক্ত হাদিসটিতে আরোও বলেছেন :

“আমার বংশধরদের আমার ভালবাসার কারনে ভালোবাস ।”

আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) রক্তজ বংশধরদের ভালবাসার প্রয়োজনীয়তা ।

আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) রক্তজ বংশধরদের রাসূলের (সাঃ) ন্যায় ভালবাসার স্বপক্ষে দলীল ।

১) – রাসূলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র রক্তজ বংশধরগন রাসূলের (সাঃ) সঙ্গে সম্পর্কিত , যা বিশেষ মর্যাদার । এই কারনেই রাসূল (সাঃ) বলেছেন ,‘ কিয়ামতের দিন সকল সর্ম্পক ছিন্ন হয়ে যাবে , শুধু আমার সাথে সম্পর্ক ব্যতীত ।’

২) – আল্লাহর রাসূলের বংশধরগণ আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসার পাত্র। এ বিষয়টি হাদীসে কিসাসহ৩৩৪ অন্যান্য হাদীসে এসেছে।

৩) – মুহাম্মদের (সাঃ) রিসালাতের প্রতিদান তাঁর আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা পোষনের মাধ্যমে দেওয়া হয় ।

যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন –

“ — বলুন , আমি আমার রিসালাতের দায়িত্ব পালনের বিপরীতে কোন প্রতিদান চাই না , আমার রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়ের প্রতি ভালবাসা পোষণ ছাড়া —-। ”

সূরা – শুরা / ২৩ ।

৪) – কিয়ামতের দিন রাসূলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতের (আঃ) প্রতি ভালবাসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হইবে ।

“— থামাও তাদের , কারন তাদের অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে — ” ।

সুরা – সাফফাত , আয়াত – ২৪ ।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ননা করেন যে ,

তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হইবে অর্থাৎ হযরত আলী ইবনে আবু তালিবের (আঃ) বেলায়েত বা ইমামতের ব্যাপারে তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হইবে ।

ইহা আবু সাঈদ খুদরী , মুনদিল আনযী , সাঈদ বিন যোবাইর বর্ননা করিয়াছেন ।

সূত্র – সাওয়ায়েকে মুহরিকা , পৃ- ৮৯ / ফুসুলুল মোহিম্মা , পৃ- ১৩ / নুরুল আবসার , পৃ- ১৩ / তাফসীরে আলুসী , ২৩ তম খন্ড , পৃ- ৭৪ / মুরাজেয়াত , পৃ – ৫৮ / তাফসীরে কুমী , ২য় খন্ড , পৃ- ২২২ / শাওয়াহেদুত তানযিল , ২য় খন্ড , পৃ- ১০৬ / গায়াতুল মোরাম , পৃ – ২৫৯ / তাফসীরে ফুরাত , পৃ- ১৩১ / ফাজায়ালুল খামছা , ১ম খন্ড , পৃ- ২৮ ।

সুপ্রিয় পাঠক ,

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নবীর (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বায়েতগনকে (আঃ) অনুসরন , আনুগত্য , সম্মান ও ভালবাসতে আদেশ দিয়েছেন ।

আহলে বায়েতগনর (আঃ) শানে দরুদ পাঠানো প্রত্যেক নামাজে আল্লাহ বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন । গাদীর এ খুমে নবীজী (সাঃ) ওনার ইন্তেকাল পরবর্তীতে মাওলা আলীকে (আঃ) প্রথম ইমাম বা খলীফা হিসাবে আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন ।

উপরিউক্ত আয়াতের বিষয়ে সিবতে ইবনে জাওযী মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেছেন ,‘ কিয়ামতের দিন হযরত আলীর (আঃ) প্রতি ভালবাসা পোষণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হইবে ।’

সূত্র – তাযকিরাতুল খাওয়াস ,পৃ. ১০ ।

৫) – মহানবীর (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনকে (আঃ) পবিত্র কোরআনের সমকক্ষ হিসেবে সম্মানের ও ভালবাসার পাত্র হিসাবে ঘোষনা দেওয়া হয়েছে ।

যেমনটি হাদিসে সাকালাইনে বলা হয়েছে ।

“হে মানবসকল , নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ন দুটি ভারী জিনিষ (সাকালাইন) রেখে যাচ্ছি , যদি এই দুইটি আঁকড়ে ধরে থাক তাহলে কখনই পথভ্রষ্ট হবে না । প্রথমটি হচ্ছে , পবিত্র কোরআন এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে , আমার ইতরাত , আহলে বাইত (রক্তজ বংশধর) । নিশ্চয়ই এই দুইটি জিনিষ হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনই পরস্পর থেকে বিছিন্ন হবে না ” ।

সূত্র – সহীহ তিরমিজি , খন্ড – ৬ , হাদিস – ৩৭৮৬ , ৩৭৮৮ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) / মেশকাত , খন্ড – ১১ , হাদিস – ৫৮৯২ , ৫৮৯৩ (এমদাদীয়া লাইব্রেরী) / তাফসীরে মাযহারী , খন্ড – ২ , পৃষ্ঠা – ১৮১ , ৩৯৩ (ইফাঃ) / তাফসীরে হাক্কানী (মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী ) , পৃষ্ঠা – ১২ , ১৩ (হামিদীয়া লাইব্রেরী) / তাফসীরে নুরুল কোরআন , খন্ড – ৪ , পৃষ্ঠা – ৩৩ (মাওলানা আমিনুল ইসলাম) / মাদারেজুন নাবুয়াত , খন্ড – ৩ , পৃষ্ঠা – ১১৫ (শায়খ আব্দুল হক দেহলভী) / ইযাযাতুল খিফা (শাহ ওয়ালিউল্লাহ) , খন্ড – ১ , পৃষ্ঠা – ৫৬৬ / মুসলিম মুসনাদে আহমদ / নাসাঈ / কানযুল উম্মাল / তাফসীরে ইবনে কাছির / মিশকাতুল মাছাবিহ / তাফসীরে কবির / মুসনাদুল ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল , লেখক – আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ শাইবানী (মৃত্যু – ২৪১হি .), খন্ড ১৭ , পৃ – ১৭০, ২১১, ৩০৯, খন্ড ১৮, পৃ: নং ১১৪, খন্ড ২৩, পৃ: নং ১০ ও ১১, প্রকাশক – মুয়াসসিসাতুর রিসালা , প্রথম প্রকাশ – ২০০১ ইং / সহীহ মুসলিম, লেখক – মুসলিম বিন হাজ্জাজ নিশাবুরী (মৃত্যু – ২৬১হি.), খন্ড ৪, পৃ – ১৮৭৩, প্রকাশনা – দারুল ইহইয়াইত তুরাসিল আরারী, বৈরুত / সুনানুত তিরমিযি , লেখক – মুহাম্মাদ ইবনে ইসা আত্ তিরমিযি (মৃত্যু: ২৭৯হি.), খন্ড – ৫ম , পৃ – ৬৬৩, প্রকাশক – শিরকাতু মাকতাবাতি ওয়া মাত্ববায়াতি মুসত্বাফা আল বাবি আল হালাবি, মিশর , দ্বিতীয় প্রকাশ – ১৯৭৫ ইং / উসুদুল গ্বাবা ফি মা’রিফাতিস সাহাবা, লেখক – আবুল হাসান আলী ইবনে আবিল কারাম ইবনে আসির (মৃত্যু: ৬৩০হি.), খন্ড ২য় , পৃ – ১৩, প্রকাশক: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা , প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৪ ইং / তাফসিরুল দুররিল মানসূর, লেখক – আব্দুর রাহমান ইবনে আবি বাকর জালালুদ্দীন সুয়ুতি (মৃত্যু: ৯১১হি.), খন্ড ৭ম, পৃ – ৩৪৯, প্রকাশক – দারুল ফিকর, বৈরুত / আল মুসান্নাফ ফিল আহাদিস ওয়াল আসার, লেখক – আবু বাকর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ (মৃত্যু: ২৩৫হি.), খন্ড ৬ষ্ঠ , পৃ – ৩০৯, প্রকাশক – মাকতাবাতুর রুশদ, বিয়াদ, প্রথম প্রকাশ – ১৪০৯ হিজরী / কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফআ’ল, লেখক – আলাউদ্দীন আলী ইবনে হিসামুদ্দীন আল ক্বাদেরী আল মুত্তাক্বী আল হিন্দী (মৃত্যু: ৯৭৫হি.), খন্ড ১ম. পৃ – ১৭২, ১৮৬, ১৮৭, খন্ড ১৪তম , পৃ – ৪৩৫, মুয়াসসিসাতুর রিসালা , পঞ্চম প্রকাশ: ১৪০১হি . ১৯৮১ইং / তাফসীর ইবনে কাসির , লেখক – আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনে উমার ইবনে কাসির আদ দামেশক্বী (মৃত্যু: ৭৭৪হি.), খন্ড ৭ম, পৃ – ১৮৫, প্রকাশক – দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যা, প্রথম প্রকাশ: ১৪১৯হি., বৈরুত / আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ৭ম, পৃ – ৬৬৮, লেখক – আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনে উমার ইবনে কাসির আদ দামেশক্বী (মৃত্যু: ৭৭৪হি.) , প্রকাশক – দারুল হিজরিন লিততাবায়া’ ওয়ান নাশর ওয়াত তাওযিহ ওয়াল ই’লান, প্রথম প্রকাশ – ১৪১৮হি. ২০০৩ ইং / সাহিহ ওয়া দ্বাইফুল জামিয়’ আস সাগ্বির ওয়া যিয়াদাতিহি , লেখক – আব্দুর রাহমান ইবনে আবি বাকর জালালুদ্দীন সুয়ুতি (মৃত্যু: ৯১১হি.), খন্ড ১ম, হাদিস নং – ৪২২২, ৪২২৩, ৫২৪৮, ৫৫৪৩ ও ৮২৩৯ / মাজমাউয যাওয়াইদ, লেখক – আবুল হাসান নুরুদ্দীন আলী ইবনে আবি বাকরইবনে সুলাইমান আল হাইসামী (মৃত্যু: ৮০৭হি.), খন্ড ১ম , পৃ – ১৭০, খন্ড ৯ম, পৃ – ১৬৩-১৬৫, খন্ড ১০ম, পৃ – ৩৬৩, প্রকাশক – মাকতাবাতুল ক্বুদসী, প্রকাশকাল: ১৪১৪হি. ১৯৯৪ইং / আল মুসতাদরাক আস সাহিহাইন, লেখক – আবু আবদিল্লাহ আল হাকিম মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ আন নিশাবুরী (মৃত্যু: ৪০৫হি.), খন্ড ৩য় , পৃ – ১১৭, ১১৮, ১৬০, প্রকাশক – দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যা, প্রথম প্রকাশ – ১৪১১হি. ১৯৯০ইং, বৈরুত / হিল্লিইয়্যাতুল আওলিয়া ওয়া ত্বাবাক্বাতুল আসফিয়া, লেখক – আবু নাঈম আহমাদ ইবনে আবদিল্লাহ আল ইসফাহানী (মৃত্যু: ৪৩০হি.), খন্ড ১ম , পৃ – ৩৫৫, প্রকাশক – আসসাআদাহ্ বি-জাওয়ারি মুহাফিযাতি মিসর, প্রকাশকাল ১৩৯৪হি. ১৯৭৪ইং / আস সাওয়ায়িক্বুল মুহরিক্বাহ , লেখক – আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হাজার আল হাইসামী (মৃত্যু: ৯৭৪হি.), খন্ড ১ম , পৃ – ১০৯, খন্ড ২য় , পৃ- ৩৬১, ৩৬৮, ৪৩৮, ৬৫২, ৬৫৩, প্রকাশক — মুয়াসসিসাতুর রিসালা, প্রথম প্রকাশ: ১৪১৮হি./ ১৯৯৮ ইং, বৈরুত ।

৬) – নবীজীর (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) প্রতি ভালবাসা সুন্নী-শীয়া উভয় সূত্রে সহীহ হাদিস মতে ঈমানের অন্যতম মূল শর্ত।

এই কারনেই মহানবী (সাঃ) হযরত আলীকে (আঃ) বলেছেন ,

‘হে আলী , তোমাকে মুমিন ব্যতীত ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ব্যতীত তোমার প্রতি কেউ বিদ্বেষ পোষন করবে ন।’

৭) – আহলে বাইতগন (আঃ) হচ্ছেন রাসূলের (সাঃ) উম্মতের মুক্তির তরী । শীয়া-সুন্নী উভয় সূত্রে মহানবী (সাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে ,‘ আমার আহলে বাইতের দৃষ্টান্ত তোমাদের মাঝে নূহের তরণীর ন্যায় । যে তাতে আরোহণ করবে মুক্তি পাবে এবং যে আরোহন করবে না উঠবে সে নিমজ্জিত ও ধ্বংস হবে ।’

৮) – নবীজীর (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) প্রতি ভালবাসা হচ্ছে সমস্ত ইবাদত-আমল কবুলের শর্ত । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হযরত আলীকে (আঃ) উদ্দেশ্য করে বলেছেন ,‘ যদি আমার উম্মত এতটা রোজা রাখে যে , তাতে তাদের কোমর বাঁকা হয়ে ধনুকের মতো হয় , এতটা নামাজ পড়ে যে সূতায় পরিণত হয় । কিন্তু অন্তরে তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষন করে তবে আল্লাহ তাদের মুখে জাহান্নামের আগুন লেপ্টে দিবেন অর্থাৎ তাদের দোযখে নিক্ষেপ করবেন ।’

সূত্র – তারিখে দামেস্ক ,১২তম খন্ড ,পৃ. ১৪৩ ।

উক্ত হাদিসসমূহ হতে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে , শোকানুষ্ঠান পালন তাঁদের প্রতি ভালবাসারই প্রকাশস্বরূপ ।

খ) –

বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য ক্রন্দন –

১) – আল্লাহর নবীর (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) জন্য বিশেষত ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য শোক ক্রন্দন তাঁদের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ এবং বুদ্ধিবৃত্তি তা সমর্থন করে ।

২) – আহলে বাইতের (আঃ) জন্য অশ্রু বর্ষন বিশেষত ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য অশ্রুত্যাগ আল্লাহর নিদর্শনকে জাগরুক করার ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতীক ।

৩) – ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য ক্রন্দন প্রকৃতপক্ষে পূর্ণতার সকল গুণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তনের শামিল । কারন ইমাম হুসাইনের (আঃ) প্রতি ভালবাসা নিছক ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোন বিষয় নয় । বরং ইসলামের পূর্ণতার সকল দিক তাঁর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল এবং তিনি আল্লাহর দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করতে মজলুমভাবে শহীদ হয়েছেন । তাঁর জন্য ক্রন্দন মূলত সত্য ও ন্যায়ের জন্যই ক্রন্দন ।

তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমেই সত্য ও ন্যায় প্রকাশিত হয় । তাঁর লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতির পরিচয় লাভের মাধ্যমেই ইসলামের পরিচয় লাভ করা যায় । আর তাই হাদিসে তাঁর শাহাদাতের স্মরণে ক্রন্দনের সওয়াব সম্পর্কে বলা হয়েছে ,‘ যে কেউ ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য ক্রন্দন করবে অথবা কাউকে কাঁদাবে অথবা অন্তত কান্নার ভাব করবে , তার জন্য বেহেশত ওয়াজীব হবে ।’

কারন ইমাম হুসাইনের (আঃ) পরিচয় এবং তাঁর অবিস্মরণীয় কর্মের সাথে পরিচয় লাভের ফলে মানুষ আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন ও তাঁর জন্য আত্মত্যাগে উৎসাহিত হয় ।

৪) – মানুষ যতক্ষণ তার অভ্যন্তরীণ সত্তার দিকে প্রত্যাবর্তন না করে এবং আল্লাহর বিশেষ বান্দার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত না করে ততক্ষণ তার অন্তর নরম ও কোমল হয় না । তার কান্নাও আসে না ।

তাই ইমাম হুসাইনের (আঃ) মতো ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করার মাধ্যমে মানুষ যখন নিজের দিকে প্রত্যাবর্তন করে তখন সে মূলত নিজ সীমিত অন্তরের সঙ্গে অসীম এক অন্তরের সম্পর্ক স্থাপন করে । সুস্পষ্ট যে , এরূপ সম্পর্ক স্থাপনের ফলে মানুষ অসীমের সাথে সংযুক্ত হয় । যেমনভাবে কোন ক্ষুদ্র গর্তে জমা পানিকে যদি অসীম সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত করা না হয় ঐ স্বল্প পানি অসীমের সংস্পর্শ ছাড়া দুর্গন্ধময় হয়ে যায় অথবা রৌদ্রতাপে শুকিয়ে যায় । কিন্ত যদি ঐ ক্ষুদ্র পানিকেই মহাসমুদ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় তবে ঐ ক্ষুদ্র পানিটুকুই সকল প্রকার কলুষতা থেকে মুক্ত ও ধ্বংস হতে রক্ষা পায় ।

৫) – মজলুম ব্যক্তির (যার প্রতি অবিচার করা হয়েছে , অন্যায় করা হয়েছে ও তার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে) জন্য ক্রন্দন মানুষকে তার প্রতি সহানুভূতিশীল করে । ফলে সে নিজেকে ঐ মজলুমের সপক্ষ ভাবে বিশেষত ঐ মজলুম যদি কোন নবী বা তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধি ও নিষ্পাপ কোন ব্যক্তি হয় । তাহলে তাঁর প্রতি ভালবাসা পোষনকারী ব্যক্তি শরীয়ত ও তাঁর আনীত দ্বীনের রক্ষক হওয়ার ব্রত নেয় ।

মনস্তত্ত্ববিদগন এই বিষয়টি সমর্থন করেন । তাই আমরা ইতিহাসের পরিক্রমায় লক্ষ্য করি শীয়ারা ইমাম হুসাইনের (আঃ) শাহাদাতের শোকাবহ ঘটনা হতে আত্মজাগরণের সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহনের কারণে সবসময়ই নির্যাতিত ও মজলুমের সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ।

৬) – আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য ক্রন্দন বিশেষত ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য ক্রন্দন দগ্ধ হৃদয়ের জন্য প্রশান্তির কারন ।

ইমাম হুসাইনের (আঃ) উপর আপতিত মুসিবতের স্মরনে হৃদয়ে যে অগ্নি প্রজ্বলিত হয় (তাঁর ভালোবাসায় পূর্ণ ব্যক্তির হৃদয়ে) তাঁর জন্য অশ্রু বিসর্জন ঐ দগ্ধ হৃদয়কে উপশমে সাহায্য করে ।

৭) – আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য ক্রন্দন মানুষের হৃদয়কে নরম করে তাদের হৃদয় হতে কলুষতাকে দূর করে । ফলে তার হৃদয় ঐশী নূরে আলোকিত হওয়ার সুযোগ পায় । ঐ অশ্রু তার অন্তরের সকল মরিচা দূর করতে সাহায্য করে ।

৮) – ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য ক্রন্দন অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে এক প্রকার বাস্তব সংগ্রাম । এর মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় অত্যাচারী শাসকদের আচরনের প্রতি আমরা বীতশ্রদ্ধ ও ক্রন্দন তাদের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ।

এ কারনেই মহানবীর (সাঃ) ইন্তেকালের পর বনু সকিফায়ে বনী হযরত আলীর (আঃ) ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার প্রতি উত্তরে হযরত ফাতিমা যাহরা (সাঃআঃ) বিরামহীন ক্রন্দনের মাধ্যমে আনসার ও মুহাজিরদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে , তিনি তাদের অন্যায় কর্মের প্রতি প্রচন্ড অসন্তুষ্ট ।

যদিও রাসূলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগন (আঃ) ছিলেন ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার মূর্ত প্রতীক ও এক্ষেত্রে মানব জাতির জন্য আদর্শ ।

কিন্ত তাঁরা এ কর্মের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি কৃত অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন ও সকলকে তা অবহিত করেছেন ।

৯) – বার ইমামীয়া শীয়ারা নবীজীর (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) বিশেষত শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য শোক ক্রন্দনের মাধ্যমে ঘোষণা করে যে , আমরা ইতিহাসের পরিক্রমায় ঈয়াযীদ ও ঈয়াযীদের অনুসারীদের বিরোধী এবং ইমাম হুসাইন (আঃ) ও তাঁর মতো ব্যক্তিত্বদের পক্ষে আছি ।

এ লক্ষ্যেই বার ইমামীয়া শীয়ারা ইমাম হুসাইনের (আঃ) স্মরনকে শোক-ক্রন্দনর মাধ্যমে চিরজাগরুক রাখে ।

পাঠক ,

অজ্ঞ অশিক্ষিত কাঠমোল্লাদের কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়া বিশেষ করে মজলুম ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য সাধ্যমত শোক-ক্রন্দন করুন ।

আজকের মত বিদায় ।

খোদা-হাফেজ ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 11 =