আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের পবিত্র কবর জিয়ারতের দর্শন ।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক আয়াতুল্লাহ জিয়াউদ্দীন নাজাফী তেহরানি বলেছেন যে , মহান আল্লাহর প্রকৃত অলী-আওলিয়াদের মাজার জিয়ারত মানুষের আত্মার শান্তি এনে দেয় এবং মানুষকে খোদামুখী করে ।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন যে , ইরানের মাশহাদ নগরীতে অবস্থিত অষ্টম ইমাম রেজার (আঃ) পবিত্র মাজার শুধু ইরানি মুসলমানদের জন্য নয় বরং সমগ্র মুসলিম জাহানের জন্য গৌরব ও অহংকারের বিষয় ।
এ মাজারকে কেন্দ্র করে ইসলাম ও পবিত্র কোরআনের শিক্ষা প্রচারের শক্তিশালী ঘাটি গড়ে উঠেছে । তাছাড়া এ মাজারে প্রতিদিন লাখ লাখ ধর্মপ্রান লোক ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে নিজেদেরকে খোদামুখি করছে । সাধরন জনতা একজন মাসুম ইমামের (আঃ) ওসিলা দিয়ে নিজেদের কৃত গুনাহের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছে ।
অথচ ওহাবীরা মাজার জিয়ারতকে শিরক মনে করে ।
কিন্ত তাদের এ ধারনা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন । কেননা প্রকৃত অলী-আওলিয়াগণ নিজেদের সুউচ্চ ঈমান ও তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী । তাই সাধারন লোকেরা তাদের মাজারে গমণ করে নিজেদের ভক্তি নিবেদন করে ।
তিনি বলেন , প্রকৃত অলী-আওলিয়াগণের মাজার মানুষের মন ও আত্মার উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি তাদেরকে খোদামুখী করে থাকে ।

প্রিয় পাঠক ,
এবারে বিস্তারিত আলাপে চলুন ।
মহান আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলীয়াদের বিশেষত মহানবী (সাঃ) ও তাঁর পুতঃপবিত্র আহলে বাইতের ইমামদের (আঃ) কবর জিয়ারতের বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রভাব ও বরকত রয়েছে ।
এখানে আমরা আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবর জিয়ারতের কিছু আত্মিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করছি ।

১) –
সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়া ও ধর্মীয় ব্যক্তিগণ প্রকৃতপক্ষে সকলের আদর্শ , যাদের অনুসরনের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য লাভ ও পূর্ণতায় পৌঁছানো যায় ।
শুধু মুসলিম সমাজেই নয় বরং যে কোন সমাজেই তাঁদের অনুসরণীয় ব্যক্তিদের মহৎ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস চালায় যাতে করে অন্যরাও তাঁদের অনুসরণের মাধ্যমে পূর্ণতা ও সাফল্যের পথে পা রাখতে পারে । যদিও এই অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গ জীবিত নেই । কিন্তু তাঁদের কবর ও স্মৃতিসৌধে গমনের আহ্বান তাঁদের পথে চলতে অন্যদের অনুপ্রাণিত করে ।

অনেক দেশেই কোন বিশেষ চত্বর বা ভাস্কর্যকে নাম না জানা আত্মত্যাগী সৈনিকদের নামে নামকরণ করা হয় । কারন তারা দেশপ্রেমের প্রতীক এবং এ পথে নিজ জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন । এ কর্মের মাধ্যমে ঐ জাতি চায় নতুন প্রজন্মকে তাদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বহিঃশত্রুর হাত হতে দেশ রক্ষার মহান ব্রত নিতে উদ্বুদ্ধ করে ।

জাতির মহান ব্যক্তিবর্গ ও আদর্শ নেতাদের কবরের নিকট যাওয়ার বিশেষ আত্মিক প্রভাব রয়েছে মনস্তত্ত্ববিদগণ এ বিষয়ের উপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন ।

আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ বলেছেন , সময়ের পরিক্রমায় এমন দিন আসল যখন মজলুম ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য সকল পথ রুদ্ধ করে কারবালার দিকে যেতে তাঁকে বাধ্য করা হল । আজ পর্যন্ত কারবালার ইতিহাস ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে , প্রকৃত প্রস্তাবে তা মানবজাতির ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে ।

কারবালা বর্তমানে এমন এক স্থানে পরিণত হয়েছে যে , যেখানে মুসলমানগণ শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে জিয়ারতে যায় । এমনকি অমুসলমানরাও সেখানে ভ্রমণ ও দর্শনের উদ্দেশ্যে যায় ।
কিন্তু কারবালার অধিকার তখনই আদায় হবে যখন তা মানুষের জন্য পবিত্রতা ও মর্যাদায় বিশ্বাসী প্রতিটি ব্যক্তির জিয়ারতের স্থানে পরিণত হবে । কারন আমার এমন কোন স্থানের কথা জানা নাই যা কারবালার ন্যায় মানবতার সকল মর্যাদাপূর্ণ ও ইতিবাচক সুন্দর দিকের স্মৃতি বহন করছে এবং এ বৈশিষ্ট্য সেটি ইমাম হুসাইনের (আঃ) শাহাদাতের মাধ্যমে অর্জন করেছে ।
সূত্র – আবুশ শুহাদা , আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ ,পৃ. ১২৯ ।

২) –
জিয়ারত হচ্ছে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ও প্রতিচ্ছবি – এতে সামান্যতম সন্দেহ নাই । রাসুলের (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতের (আঃ) প্রতি ভালবাসা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের উপর ওয়াজীব বা বাধ্যতামূলক ।
মহানবী (সাঃ) বলেছেন , আমার ভালবাসার কারনে আমার আহলে বাইতকে ভালবাস ।’
সূত্র – মুসতাদরাকে হাকিম , তৃতীয় খন্ড ,পৃ. ১৪৯ ।

এ কারনেই আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) প্রতি ভালবাসা যেমনি ওয়াজীব তেমনই তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসাও তদ্রুপ ওয়াজীব ।
আমরা জানি ভালবাসার অবশ্যই প্রকাশ আছে যা শুধু তাঁদের আনুগত্য ও আন্তরিক ভালবাসা পোষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় । তাঁদের পবিত্র কবর জিয়ারতও ঐ আন্তরিক ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ।

৩) –
মহানবীর (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগনের (আঃ) পবিত্র কবর জিয়ারত তাঁর রেসালতের দায়িত্বে একরূপ বিনিময় স্বরূপ ।
মহান আল্লাহ বলেছেন ,
“ – বল , আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোন পুরস্কার চাই না , শুধু আমার রক্তজ বংশধরদের প্রতি গভীর ভালবাসা ছাড়া – “ ।
সুরা – শুরা / ২৩ ।

রাসূলের (সাঃ) রক্তজ নিকট আত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা পোষন এবং প্রকাশের অন্যতম কর্ম হল তাঁদের পবিত্র কবর জিয়ারত করা ।

৪) –
আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবর জিয়ারত তাঁদের অনুসৃত পথের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গভীরতার নিদর্শন ।

৫) –
আল্লাহর প্রকৃত অলি-আউলিয়াগণের কবর জিয়ারত বাস্তবিকভাবে তাঁদের সঙ্গে নতুন করে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হওয়া যে , তাঁদের আদর্শ ও পথকে আমরা চিরজাগরুক রাখব ।
আমরা জানি আহলে বাইতের ইমামগণ (আঃ) আমাদের উপর অধিকার ও অভিভাবকত্ব রাখেন । তাই আমাদেরও উচিত তাঁদের অভিভাবকত্ব ও আমাদের উপর অধিকারকে মেনে নিয়ে তাদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া । এই প্রতিশ্রুতি শুধু মুখে ঘোষণার মাধ্যমে নয় বরং নিজেদের কর্মের মাধ্যমে এই আন্তরিক প্রতিশ্রুতির প্রকাশ ঘটাব ।
তাঁদের ইন্তেকালের পর তাঁদের কবর জিয়ারত ও তাঁদের রওজায় উপস্থিতির মাধ্যমে এই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি ঘটাব ।
এ কারনেই ইমাম রেজার (আঃ) হাদীসে এসেছে – নিশ্চয়ই প্রতি ইমামের তাঁদের অনুসারীদের উপর অধিকার ও প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা রক্ষা ও পালনের সর্বোত্তম পন্থা হলো তাঁদের কবর জিয়ারত করা ।’
সূত্র – তাহজীবুল আহকাম , ষষ্ঠ খন্ড ,পৃ. ৭৮-৭৯ ।

৬) –
আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবর জিয়ারত মানুষের আধ্যাত্মিকতাকে বৃদ্ধি করে ও হৃদয়ে নতুন প্রান সঞ্চার করে ।

৭) –
আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবর জিয়ারত তাঁদের সন্তুষ্টির কারণ হয় এবং তাঁদের দোয়ার ফলে ঐশী বরকত জিয়ারতকারীর উপর অবতীর্ণ হয় ।

৮) –
প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের নিকটে গেলে তাঁদের ঐতিহাসিক অবদান ও আত্মত্যাগের কথা সকলের স্মরণ হয় যা তাঁদের অনুসৃত পথে চলার দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করে ।

৯) –
সর্বোপরি তাঁদের কবর জিয়ারত তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সন্ধির এবং তাঁদের শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষনা স্বরূপ ।

সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ যে , আমার মত অর্ধশিক্ষিত গন্ড মূর্খ কাঠমোল্লার আজেবাজে ফতোয়া দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে সাধ্যমত জগতের সকল প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের পবিত্র মাজার জিয়ারত করুন এবং নিজের মন ও আত্মাকে উজ্জীবিত করুন । ওনাদের ওসিলায় নিজেকে পাপমুক্ত করুন এবং নিজেকে আরও বেশী করে খোদামুখী করুন ।

আজকের মত আলাপের এখানেই সমাপ্তি ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + 16 =