পবিত্র শুভ বিবাহ বার্ষিকী ।

পহেলা জিলহজ্ব , ১৪৪১ হিজরী ।
পহেলা জিলহজ্ব দিনটি খুবই পবিত্র এবং আনন্দময় ।

ইমাম আলী (আঃ) এবং ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) এর শুভ বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে সকলের প্রতি আন্তরিক অভিবাদন ও শুভেচ্ছা ।

সালামুন আলাইকুম —
প্রিয় পাঠক ,

– ইমাম আলী (আঃ) ও খাতুনে জান্নাত ফাতেমা (সাঃআঃ) এর শুভ বিবাহ বার্ষিকী ।

ইমাম আলী (আঃ) এবং খাতুনে জান্নাত ফাতেমা যাহরার (সাঃআঃ) বিবাহের সাথে গোটা জগত সংসারের অন্য কারও বিবাহের তুলনা হতেই পারে না ।

লক্ষ্য করুন —
পাত্রের জন্ম খোদ আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবার এক্কেবারে অভ্যন্তরে ।
পাত্র স্বয়ং জান্নাত ও জাহান্নাম বন্টনকারী ।

পাত্রীর জন্ম খোদ রাসুলের (সাঃ) পবিত্র ঘরে ।
পাত্রী স্বয়ং জান্নাতের সম্রাজ্ঞী ।

এই বিবাহের প্রধান ঘটক স্বয়ং মহান আল্লাহ ।
সারা পৃথিবীতে এই রকম সোনায় সোহাগা বর-কনের জুটি শুধুমাত্র এই একটি ।

আসুন , ইতিহাস থেকে জেনে নেই এই বিবাহ প্রসঙ্গে ।

এই শুভ বিবাহ যখন এই ধরনীতে সুসম্পন্ন হল তখন হযরত জাবের (রাঃ) বর্ননা করেন যে , হযরত উম্মে আয়মন (রাঃ) মহানবীকে (সাঃ) বললেন যে , “ইয়া রাসুল আল্লাহ , কিছুদিন পূর্বে এক সাধারন আনসার কন্যার বিবাহ জাকজমকভাবে পালিত হল । আর আজ দুই জাহানের বাদশাহের একমাত্র কন্যার বিবাহ এইরুপ সাধারনভাবে সম্পন্ন হইল” !
উত্তরে নবীজী (সাঃ) বললেন , “আল্লাহর শপথ করে বলছি , আলী ও ফাতেমার বিবাহের সাথে দুনিয়ার অন্য কারও বিবাহের তুলনা হতেই পারে না । কারন আজ তাদের বিবাহ উপলক্ষে আরশে মোয়াল্লার নিকট আল্লাহর হুকুমে জিব্রাঈল , মিকাঈল এবং অন্যান্য প্রধান ফেরেশতাগন একত্রিত হয় উৎসবরত রয়েছেন ।
সমগ্র বেহেশতকে আজ অপূর্ব সাজে সজ্জিত করা হয়েছে । জান্নাতের সকল হুর-গেলমানগন সুসজ্জিত পোষাক পরিধান করে আনন্দ উল্লাসে মাতোয়ারা রয়েছে ।
জান্নাতের সকল পাখীরা খুশীর কুজ্ঞনে সমগ্র জান্নাত সুরের মুর্ছনায় মাতোয়ারা করে তুলেছে । জান্নাতের বিখ্যাত তুবা বৃক্ষ থেকে উজ্জল মনি মুক্তো চর্তুদিকে বিক্ষিপ্ত হচ্ছে ।
মহান আল্লাহ জান্নাতের প্রধান তত্বাবধায়ক রেজওয়ান ফেরেশতাকে আদেশ করলেন , চতুর্থ আসমানে বাইতুল মামুরের তোরন দ্বারে একটি বেদী নির্মান করে , রাহিল নামক ফেরশতাকে তোরন নির্মানের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করবার জন্য নির্দেশ দিলেন ।

রাহিল ফেরেশতা সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর প্রসংশা পাঠ করে ঘোষনা করলেন যে , “হে স্বর্গ ও মর্তবাসী সৃৃষ্টিকুল ! তোমরা জেনে রাখো , আজ দয়াময় আল্লাহর ইচ্ছায় ও অনুমতিতে ওনার প্রিয় নবী মুহাম্মাদের (সাঃ) একমাত্র কন্যা খাতুনে জান্নাত ও আল্লাহ সবচে প্রিয় বান্দা হযরত আলীর শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হইল” ।

মহানবী (সাঃ) আরও বলেন যে , “ইয়া ফাতেমা , তুমি কি জানো , মহান আল্লাহ পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবং এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে তোমার পিতাকে মনোনীত করলেন এবং আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন যে , আমি যেন আলীকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ব করি ও আলীকে আমার স্থলাভিষিক্ত ঘোষনা করি” ।
সূত্র – খাতুনে জান্নাত ফাতেমা যাহরা , পৃ-৪৫ (রহমানীয়া লাইব্রেরী) / হযরত ফাতেমা যাহরা ,পৃ-৩৯,৪০ (তাজ কোং) / হযরত ফাতেমা যাহরা , পৃ-৮৬ (হামিদিয়া) / হযরত আলী ,পৃ-৩৪ (তাজ কোং) / আরজাহুল মাতালেব,পৃ-৪৩৬-৪৩৯ / তাফসীরে মাযহারি , খন্ড-২,পৃ-২৭২-২৭৭ (ইঃফাঃ) / জাখায়েরুল উখরা , পৃ-৩১ / কানজুল উম্মাল ,খন্ড-৬,পৃ- ১৫৩ ,হাঃ – ২৫৪৩ / মুস্তাদরাক হাকেম , খন্ড-৩,পৃ-১২৯ / নাহাজ আল বালাগা ,খন্ড-২, পৃ-৪৫১ / মাদারেজন নবুয়ত ,খন্ড-২,পৃ-১৩১ / আরজাহুল মাতালেব ,পৃ-৪৯ / মুসনাদে আহম্মদ,খন্ড-৫,পৃ-৩১,৩৯ ।

প্রিয় পাঠক ,
এবারে চলুন ইতিহাসের আরেক দিকে —
ইমাম আলীর (আঃ) সাথে হযরত ফাতেমা যাহরার (সাঃআঃ) বিবাহ হওয়ার পূর্বে অনেকেই নবীকন্যাকে বিবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন ।
হযরত আলীর (আঃ) পূর্বে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরের মত ব্যক্তিরাও হযরত যাহরাকে (সাঃআঃ) বিবাহ করার জন্য নিজেদের প্রস্ততির কথা ঘোষনা করেছিলেন ।
উভয়েই মহানবী (সাঃ) থেকে জবাব পেয়েছিলেন যে , যাহরার বিবাহের বিষয় তিনি মহান আল্লাহর ওহীর অপেক্ষায় আছেন ।
ঐ দুজন যখন নবীকন্যাকে বিবাহ করার ব্যাপারে সম্পূর্ন হতাশ হয়ে গেলেন তখন আওস গোত্রের প্রধান সাদ ইবনে মুআযের সাথে আলোচনা করলেন ।
অতঃপর তারা বুঝতে পারলেন যে , আলী (আঃ) ব্যতীত অন্য কেউই হযরত যাহরার (সাঃআঃ) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ব হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না এবং নবীজীর (সাঃ) নিজের মতও এর বাইরে নয় ।
ফলে তারা একত্রিত হয়ে হযরত আলীর (আঃ) খোজে বের হলেন । অবশেষে আলীকে (আঃ) একজন আনসারের সাথে খেজুর বাগানে পানি দেয়ারত অবস্থায় পেলেন ।
তারা আলীকে (আঃ) উদ্দেশ্য করে বললেন , “কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নবীকন্যার পানিপ্রার্থনা করেছিলেন । মহানবী (সাঃ) তাদেরকে বলেছেন , যাহরার বিবাহের বিষয়টি মহান আল্লাহর অনুমতির সাথে সম্পর্কযুক্ত ।
ফলে আমরা আশা করি যে , তুমি যদি নবীকন্যার পানিপ্রার্থনা কর তাহলে তুমি ইতিবাচক ফল পাবে । এক্ষেত্রে যদি তোমার সম্পদ কম থাকে , আমরা তোমাকে সাহায্য করতে প্রস্তত” ।
এ কথাগুলো শুনে হযরত আলী (আঃ) দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে গেল । তিনি বললেন , “আমি রাসুলের কন্যাকে পছন্দ করি এবং তাঁকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক” ।
তিনি একথা বলে হাতের কাজ বন্ধ করে নবীগৃহের দিকে রওয়ানা হলেন ।
মহানবী (সাঃ) তখন উম্মে সালমার গৃহে অবস্থান করছিলেন ।
আলী (আঃ) নবীগৃহের দরজাতে টোকা দিতেই মহানবী (সাঃ) উম্মে সালমাকে বললেন , “ওঠো , দরজা খোল । এ হল সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে নিজের প্রানের চেয়েও অত্যাধিক ভালবাসেন” ।
উম্মে সালমা (রাঃ) বলেন , মহানবী (সাঃ) যাঁর এত প্রশংসা করলেন , সে ব্যক্তিকে চেনার আগ্রহ আমাকে এতটাই আছন্ন করেছিল যে , দ্রুত হাটার জন্য আমি পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম ।
দরজা খুলে দিলাম , আলী (আঃ) সালাম দিয়ে নবীগৃহে প্রবেশ করলেন এবং নবীজীর (সাঃ) সামনে গিয়ে বসলেন ।

কিন্ত লজ্জা ও নবীজীর (সাঃ) মহত্বের কারনে মাথা অবনত করে চুপচাপ বসে ছিলেন ।
নীরবতা ভঙ্গ করে নবীজী (সাঃ) বললেন , “মনে হয় তুমি কোন কাজে এসেছ” ।
আলী (আঃ) জবাবে বললেন , “রিসালতের পরিবারের সাথে আমার আত্মীয়তার বন্ধন এবং দ্বীনের পথে আমার দৃঢ়তা , জিহাদ ও ইসলামের অগ্রগতিতে আমার প্রচেষ্টা সম্বন্ধে আপনি অবগত আছেন” ।
মহানবী (সাঃ) বললেন , “হে আলী , তুমি যা বলছ , তোমার অবস্থান তার চেয়েও বহুগুন উপরে” ।
আলী (আঃ) বললেন , “ফাতেমার সাথে আমার বিবাহ হওয়ার বিষয়টিকে আপনি কি মঙ্গলজনক মনে করেন” ?

মহানবী (সাঃ) এক্ষেত্রে নিজ জীবনসঙ্গী নির্বাচনে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূলনীতিকে অনুসরন করলেন ।
আলী (আঃ) এর প্রস্তাবের জবাবে বললেন , “তোমার পূর্বে আরও কয়েকজন আমার কন্যার পানিপ্রার্থনা করেছিল । আমি তাদের আবেদনের কথা আমার কন্যাকে জানিয়েছি । কিন্ত তাদের সম্পর্কে তাঁর চেহারায় গভীর অনাগ্রহের ছাপ ফুটে উঠেছিল । এখন তোমার প্রস্তাবও তাঁকে জানাব । অতঃপর তার ফলাফল তোমাকে জানাব” ।

মহানবী (সাঃ) হযরত যাহরার (সাঃআঃ) গৃহে প্রবেশ করলেন ।
নবীকন্যা উঠে দাঁড়ালেন এবং পিতার কাধ থেকে রেদা (পোষাক বিশেষ) নামিয়ে রাখলেন , তাঁর পায়ের জুতা খুলে দিলেন ও তাঁর পবিত্র পদদ্বয় মোবারক নিজ হাতে পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেন । অতঃপর ওযু করে পিতার পাশে বসলেন ।
নবীজী তাঁর কন্যার সাথে এভাবে কথা শুরু করলেন , “আবু তালেবের পুত্র আলী হচ্ছে এমন ব্যক্তিদের অন্যতম , ইসলামে ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত আছি । আর আমি আল্লাহর কাছে এই কামনা করেছি যে , তিনি যেন তোমাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বরের সাথে তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করে দেন । এখন আলী তোমার নিকট পানিপ্রার্থনা করতে এসেছে । এই বিষয় তোমার মত কি” ?
এ সময় হযরত যাহরা (সাঃআঃ) এক গভীর নীরবতায় নিমগ্ন হলেন , কিন্ত নিজের চেহারা পিতার কাছ থেকে ঘুরিয়ে নেন নাই এবং তাঁর চেহারায় নূন্যতম অস্বস্তিও দেখা যায় নাই ।
মহানবী (সাঃ) উঠে দাড়ালেন এবং বললেন , “আল্লাহ মহান , তাঁর নীরবতাই তাঁর সম্মতি” ।
সূত্র – কাশফুল গ্বাম্মাহ , খন্ড- ১ম , পৃ – ৫০ ।

সম্মানীয় পাঠক ,
বরের জন্ম আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা গৃহের একবারে অভ্যন্তরে ।
কনের জন্ম নবী সম্রাট মুহাম্মাদের (সাঃ) পবিত্র গৃহে ।
এই বিবাহের ঘটক বা প্রধান সম্বন্বয়কারী স্বয়ং আল্লাহ ।

এই রকম সর্বশ্রেষ্ঠ সোনায় সোহাগা বর-কনের জুটি কেয়ামত পর্যন্ত আর দ্বিতীয়টি হয় নাই আর হবেও না ।

সর্বশেষ প্রার্থনা এটাই যে ,
হে আল্লাহ ! তোমার কাছে একটিই ফরিয়াদ জানাই —
আলী (আঃ)-ফাতেমা (সাঃআঃ) এর শীয়া হয়েই আমাদের মৃত্যু দিও ।
ঈলাহী আমিন ।

সূত্র – বেলায়েতের দ্যুতি ,
মূল লেখক – আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী ,
বাংলা অনুবাদ – আব্দুল কুদ্দুস বাদশা ও মোঃ মাঈনউদ্দিন ,
পৃ- ৮৭ ছায়া অবলম্বনে ।

পবিত্র শুভ বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে পুনরায় সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে আপাঃতত বিদায় ।
সকলেই খুব খুব আনন্দে থাকুন ।

এই কামনায় ।

 

No photo description available.
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − 6 =