—- “ঈদে গাদীর” প্রসঙ্গ —-
“ঈদে গাদীর” বলে কোন ঈদ মুসলিম ইতিহাসে আছে কি ?
ঈদুল ফিতর , ঈদুল আজহা , ঈদে মিলাদুন্নবী ব্যতীত “ঈদে গাদীর” বলে অন্য কোন ঈদ আছে কি ?
“ঈদে গাদীর” কি সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ ?
রাসুল (সাঃ) , পবিত্র ইমামগন (আঃ) এবং বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদগন “ঈদে গাদীর” বলে কোন ঈদের কথা বলে গেছেন কি ?
প্রিয় পাঠক ,
দুনিয়ার বেশীরভাগ মুসলমান সম্প্রদায় “ঈদে গাদীর” সম্পর্কে কিছুই জানেন না । “ঈদে গাদীর” – এই কথাটি তারা জীবনেও শোনেন নাই ।
মর্মান্তিক দুঃখজনক ঐতিহাসিক বাস্তবতা এটাই যে , রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর থেকে সময়ের আবতর্নে সাধারন মুসলিম জগত থেকে “ঈদে গাদীর” দিবসকে সুকৌশলে মুছে দেওয়া হয়েছে । আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কতৃক স্বীকৃত এবং ঘোষিত সর্বশ্রেষ্ঠ “ঈদে গাদীর” কেন ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল ?
আপাঃতত এটুকু জেনে নিন যে , রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর থেকে নবীজীর (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতগনের অন্তর্ভুক্ত ফাতেমা (সাঃআঃ) থেকে শুরু করে ইমাম আলী (আঃ) , ইমাম হাসান (আঃ) , ইমাম হোসেন (আঃ) থেকে একাদশ ইমাম হাসান আসকারী (আঃ) সহ ১৩ জনকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করেছে নবীরই (সাঃ) কতিপয় ক্ষমতালোভী উম্মতগন !
নেপথ্যের কারনটি অন্য কোন একদিন আলাপ হবে , ইনশা আল্লাহ ।
আজ শুধু জেনে নিন ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের রেফারেন্স থেকে লেখাটির উপরে উল্লেখিত প্রশ্নগুলির সঠিক জবাব জেনে নিন ।
সকল মুমিন মুসলমানগনকে ঈদে গাদীর উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখাটি শুরু করলাম ।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ।
ঈদে গাদীর দিবস উপলক্ষে সুন্নি কিতাবের বিভিন্ন সূত্র সমূহ ।
ঈদে গাদীর অত্যন্ত খুশী এবং আনন্দের একটি দিন ।
কেননা মানুষের জীবনে সর্ববৃহৎ ঘটনা এই দিনেই সংঘটিত হয়েছে । হাদিসের ভাষ্যনুযায়ী এই দিনেই দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে ।
সকল ঐশী দ্বীন ছিল ইসলামের ভূমিকা স্বরূপ । আর ইসলাম গাদীর দিবসে পরিপূর্ণ হয়েছে এবং মহান আল্লাহ স্বয়ং নিজে এই ধর্মকে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য নির্বাচন করেছেন ।
“ — আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম । তোমাদের প্রতি আমি আমার নেয়ামত (অনুগ্রহ) সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে পছন্দ (মনোনীত) করলাম –।”
সুরা – মায়েদাহ / ৩ ।
কোন ঘটনাই দ্বীন পূর্ণ হওয়ার ঘটনার মত মানুষের জীবনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে না । আর সে কারনেই কোন দিবসই গাদীর দিবসের মত আনন্দ-উৎসব করার ক্ষেত্রে সমতুল্য নয় । আর ঠিক এই দলীলের ভিত্তিতেই রাসূল (সা.) স্বয়ং এই দিনকে ঈদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং মুসলমানদেরকে বলেছেন যে , তাঁকে (সাঃ) যেন অভিবাদন জানানো হয় ।
এই প্রসঙ্গে রাসুল (সাঃ) বলেছেন –
” — আমাকে অভিবাদন জানাও , আমাকে অভিবাদন জানাও মহান আল্লাহ আমাকে নবুয়্যতের আর আমার পরিবারবর্গকে ইমামতের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছেন —।”
সূত্র – আল-গাদীর, ১ম খন্ড , পৃষ্ঠা-২৭৪ / আবু সাঈদ খারগুশী নিশাবুরীর লেখা শারাফুর মোস্তফা হতে বর্ণিত ।
মহানবী (সাঃ) আরও বলেন –
“গাদীর দিবসটি আমার উম্মতের জন্য সর্ববৃহৎ ঈদগুলির অন্যতম । এটা এমন একটি দিন , যেই দিনে আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দান করেছেন যে , আমার ভাই আলীকে যেন আমার উম্মতের নিশান বা নিদর্শন হিসেবে নিয়োগ দান করি যাতে আমার ইন্তেকালের পরে সে যেন এই পথকে অব্যাহত রাখে এবং ঐ দিন এমনই দিন , যে দিনে আল্লাহ দ্বীনকে পূর্ণতা ও তাঁর নেয়ামতকে আমার উম্মতের জন্য সম্পূর্ণ করেছেন আর ইসলাম তাদের দ্বীন হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন ।”
সূত্র – আল-গাদীর , ১ম খন্ড , পৃষ্ঠা-২৮৩ / ইকবালুল আমাল, পৃষ্ঠা-৪৬৬ ।
প্রিয় পাঠক ,
পবিত্র কোরআনে বর্নিত সুরা মায়েদার ৩নং আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট এবং রাসুলের (সাঃ) হাদিস মোতাবেক ১৮ই জিলহজ দিবসটি ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ “ঈদে গাদীর” হিসাবে রাসুলের (সাঃ) সময় হতেই পালিত হইত ।
রাসুলই (সাঃ) এই দিবসকে ঈদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ।
প্রকৃতপক্ষে মহানবী (সাঃ) নিজেই এই ঈদের প্রতিষ্ঠাতা ।
রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালর পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত পবিত্র ইমামগনও (আঃ) এই দিবসকে ঈদের দিন হিসেবে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতেন ।
আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) কোন এক শুক্রবার দিনে , যে দিনটি গাদীর দিবসও ছিল । সেদিন তিনি একটি খুতবা পাঠ করেন । যে খুতবায় বলেন ,
“আল্লাহ তোমাদেরকে রহমত দান করুন । আজ তোমাদের পরিবারের জন্য তোমরা উদার হস্তে খরচ করিবে । তোমাদের ভ্রাতাদের প্রতি তোমরা সদয় হও । এই নেয়ামত যা আল্লাহ তোমাদেরকে প্রদান করেছেন তারজন্য তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর । ঐক্যবদ্ধ থাক যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে বিক্ষিপ্ত অবস্থা হতে একত্রিত করতে পারেন । একে অন্যের পতি সদাচারী ও সদয় হও যাতে আল্লাহ এই সদাচরণ ও দয়ার কারণে তোমাদের সমাজের উপর কল্যাণ দান করেন । তাই মহান আল্লাহ এই ঈদের সওয়াব বা প্রতিদান অন্যান্য ঈদের তুলনায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন । তাঁর প্রেরিত নেয়ামত হতে একে অপরকে সাধ্যমত উপহার প্রদান কর । এই দিনের কল্যাণকর কাজ তোমাদের ধন-সম্পদকে বৃদ্ধি করবে ও তোমাদের আয়ু বৃদ্ধি করবে । এই দিনে তোমাদের দয়া-অনুগ্রহ আল্লাহর দয়া-অনুগ্রহকে আকৃষ্ট করবে ।”
সূত্র – আল-গাদীর , ১ম খন্ড , পৃষ্ঠা-২৮৪ / ইকবালুল আমাল, পৃষ্ঠা-৪৬৩ ।
আমরা জানি যে , আমিরুল মুমিনীন আলীর (আঃ) শাসনামলে অনেক সাহাবী জীবিত ছিলেন , যারা এই কথাগুলি শ্রবন করেছিলেন । যদি এই ঈদ তাদের নিকট সুনিশ্চিত না হত তাহলে তারা অবশ্যই প্রতিবাদ করতেন ।
অতএব , আমিরুল মুমিনীন আলীর (আঃ) সময়কাল হতে যতদিন হাদিস বর্ণনাকারীগণ হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন ততদিন পর্যন্ত এবং সকল পবিত্র ইমামগনই (আঃ) এই দিনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার বিষয় থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে , তারাঁ সকলেই এই দিনকে ঈদ হিসেবেই জানতেন এবং সম্মানের সাথে তা উদযাপন করতেন ।
সিকাতুল ইসলাম কুলাইনী , তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কাফী’তে সালেম হতে বর্ণনা করেছেন , তিনি বলেন , আমি ইমাম সাদিককে (আঃ) জিজ্ঞেস করলাম , মুসলমানদের জন্য জুম’আ , ফিতর ও আযহা ব্যতীত অন্য কোন ঈদ আছে কি ?
ইমাম (আঃ) বললেন , হ্যাঁ , সবচেয়ে বড় ঈদ ।
জিজ্ঞেস করলাম , সেটা কোন ঈদের দিন ?
ইমাম (আঃ) বললেন , যে দিন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আমিরুল মুমিনীন আলীকে (আঃ) অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন ও বলেছিলেন —
অর্থাৎ আমি যাদের মাওলা এই আলীও তাদের মাওলা ।
সূত্র – বুখারী শরীফ (৫ম খন্ড, ২৮০ পৃষ্ঠা) / মেশকাত শরীফ (১১তম খন্ড, হাদিস নং ৫৮৪৪) / সুনানে আত্ তিরমিযী (হাদিস নং , ৫.৬৩৩/ ৩৭১৩) / আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৭খন্ড,৬১২-৬১৬, ৫ম খন্ড ৩৪৩-৩৫২) (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) / ইসলামী বিশ্বকোষ , (১০/৩০৭) / সিরাতুল নবী (২য় খন্ড, ৬০৫) / আশারা মোবাশ শারা(১৬৩ পৃষ্ঠা) / তাফসীরে মাযহারী (৩ খন্ড ৩৩ পৃষ্ঠা) / তাফসীরে দুররে মানসুর (২য় খন্ড, ২৯৮ পৃষ্ঠা) / ইবনে কাসির (৫ম খন্ড, ২০৯ পৃষ্ঠা) / তাফসীরে দুররে মানসুর(৩য় খন্ড, ১১৭ পৃষ্ঠা) / তাফসীরে কাবীর (১২ তম খন্ড, ৫০ পৃষ্ঠা) / তারিখে দামেস্ক (৪৫২ পৃষ্ঠা) / মাজমাউজ জাওয়ায়েদে (৯ম খন্ড, ১০৪- ১০৭ পৃষ্ঠা / মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল (১ম খন্ড, ১১৮ পৃষ্ঠা, ৪র্থ খন্ড, ২৮১ পৃষ্ঠা, ৫ম খন্ড, ৩৪৭ পৃষ্ঠা) /
ইযাফাতুল খিফা (২য় খন্ড, ৫০৩- ৫০৪ পৃষ্ঠা) / (শাহওয়ালি উল্লাহ) সুনানে ইবনে মাজা (১ম খন্ড, ৪৩ পৃষ্ঠা) / মুস্তাদরেকে হাকেম (৩য় খন্ড,১০৯ পৃষ্ঠা) / তারিখে ইবনে কাসির (৪র্থ খন্ড, ২৮১-৩৬৮-৩৭০ পৃষ্ঠা) / তাবাকাতুল কুবরা (২য় খন্ড, ৫৭ পৃষ্ঠা) / তারিখে তাবারী (২য় খন্ড, ৪২৯ পৃষ্ঠা) / কাঞ্জুল উম্মাল (৪র্থ খন্ড, ৫৩ পৃষ্ঠা) / ফাজলুল কাদীর(২য় খন্ড,৬০ পৃষ্ঠা) / শরহে বুখারী (৮ম খন্ড, ৫৮৪ পৃষ্ঠা) / রুহুল মায়ানী(২য় খন্ড, ৩৮৪ পৃষ্ঠা) / ঐতিহাসিক আল গাদির (৫ম খন্ড, ১২৮ পৃষ্ঠা) / এলানে কাদীর (৪৮-৫০ পৃষ্ঠী) / আল-গাদীর (১ম খণ্ড পৃষ্ঠা-৩৪৪-৩৫০) / বেলায়াতের সম্রাট মাওলা আলী (আঃ) (২৮ পৃষ্টা তারিখে দামেশক , ২য় খণ্ড , পৃষ্ঠা-২১ , হাদীস-৫২১) / মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল (১ম খণ্ড , পৃষ্ঠা-১১৯) / কানজুল উম্মাল (১৩তম খণ্ড,পৃষ্ঠা-১৫৪) / মানাকিব ইবনে মাগাজেলী (পৃষ্ঠা-২৮,হাদীস-৩৮ ) / তারিখে দামেশক (২য় খণ্ড , পৃষ্ঠা-৯, হাদীস-৫০৬,পৃষ্ঠা-১১ , হাদীস-৫০৮ পৃষ্ঠা-২৪ , হাদীস- ৫২৩) ও কানজুল উম্মাল (১৩তম খণ্ড,পৃষ্ঠা-১৭০) ।
হাসান ইবনে রাশেদ থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে ,
তিনি বলেন , ইমাম সাদিককে (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম —
হে রাসুলের (সাঃ) সন্তান ! আমার প্রান আপনার জন্য উৎসর্গিত । মুসলমানদের ঈদুল ফিতর ও আযহা ছাড়াও অন্য কোন ঈদ আছে কি ?
ইমাম (আঃ) বললেন , হ্যাঁ , আছে । যেটা ঐ দুই ঈদের চেয়েও অনেক বড় ও সম্মানের ।
জিজ্ঞেস করলাম , সেটা কোন দিন ?
ইমাম (আঃ) বললেন , যেদিন আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) অভিভাবকত্বের পদ লাভ করেন ।
বললাম , আপনার জন্য আমি উৎসর্গিত । উক্ত দিনে আমাদের করণীয় কি ? ইমাম (আঃ) বললেন , রাসুলের (সাঃ) উপর ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বেশী বেশী দূরুদ পাঠ কর এবং যারা তাদের উপর জুলুম-অত্যাচার করেছে তাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ এবং লানত প্রদান কর । আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণ তাদের স্থলাভিষিক্তদেরক নির্দেশ দিতেন যে , স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণের দিনকে যেন ঈদ হিসাবে উদযাপন করা হয় ।
সূত্র – ফুরুযে কাফী , ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৮ , অধ্যায়- সিয়ামুত তারগীব, হাদিস-১ ।
অনুরূপভাবে ফুরাত ইবনে ইব্রাহিম তার তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম সাদিকের (আঃ) নিকট প্রশ্ন করা হল , মুসলমানদের কি ফিতর , আযহা , জুমআ’র দিন ও আরাফার দিন ব্যতীত অন্য কোন উত্তম ঈদের দিন আছে ?
ইমাম (আঃ) বললেন , হ্যাঁ , ঐগুলির চেয়ে উত্তম , বড় ও আল্লাহর নিকট ঐগুলির চেয়েও অতি সম্মানিত আর ঐ দিনটি হচ্ছে সেইদিন যেদিন আল্লাহ তার দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং তাঁর রাসুলের (সাঃ) উপর এভাবে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন যে ,
“ — আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম । তোমাদের প্রতি আমি আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম — ।”
সুরা – মায়েদাহ / ৩ ।
বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন , সেটা কোন দিন ?
ইমাম (আঃ) বললেন , বনী ইসরাঈলের নবীগণ সর্বদা স্থলাভিষিক্ত নির্বাচনের দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন্ করতেন । আর মুসলমানদের ঈদ হচ্ছে সেদিন যেদিন রাসুল (সাঃ) ইমাম আলীকে (আঃ) অভিভাবক বা স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণ করেছেন । আর এ উপলক্ষে কোরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এবং দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন ও তাঁর নেয়ামতকে মু’মিনদের জন্য সম্পূর্ণ করেছেন ।
সূত্র – তাফসীরে ফুরাত , পৃষ্ঠা-১১৮ ।
এই প্রসঙ্গে ইমাম (আঃ) বলেন , এই দিবসটি হচ্ছে ইবাদত , নামাজ , আনন্দ-উৎসব ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন । কারন এই দিনে আল্লাহ আমাদের অভিভাবকত্বের নেয়ামত তোমাদেরকে দান করেছেন ।
সূত্র – তাফসীরে ফুরাত , পৃষ্ঠা-১১৮ ।
পাঠক ,
আরও জেনে নিন —
ফাইয়াজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে উমর তুসী হতে বর্ণিত আছে যে , গাদীর দিবসে আমি অষ্টম ইমাম রেযার (আঃ) নিকট উপস্থিত হলাম এবং দেখলাম যে , ইমাম (আঃ) তাঁর কিছুসংখ্যক সঙ্গ-সাথীকে ইফতারের জন্য বাড়িতে বসিয়ে রেখেছেন এবং পোশাক-পরিচ্ছদ এমনকি জুতা ও আংটি যেগুলো তাদেরকে উপহার দিয়েছেন , সেগুলো তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন । তাঁর বাড়ীতে ও প্রতিবেশীদের বাড়ীতে যেন ভিন্ন রকম আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করছে । তাঁর কর্মচারীবৃন্দকে দেখলাম তারা নতুন নতুন জামা পরিধান করেছে এবং বিগত দিনের ব্যবহৃত জিনিসগুলোকেও পাল্টে নতুন করা হয়েছে । আর ইমাম রেযা (আঃ) উক্ত দিনের মর্যাদা সম্পর্কে তাদের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন ।
সূত্র – মেসবাহুল মোতাহাজ্জেদ , পৃষ্ঠা-৭৫২ ।
আলোচ্য বিষয়টি ইতিহাসেও বর্ণনা করা হয়েছে যে , মুমিন মুসলমানগন যুগ যুগ ধরে এই দিনটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ হিসেবে পালন করে আসছেন ।
আবু রাইহান বিরুনী তার রচিত গ্রন্থ “আল আসারুল বাকিয়্যাহ”তে লিখেছেন –
জিলহজ্জ মাসের ১৮ তারিখে , ঈদে গাদীরে খুম । আর ঐ নামটি এমন এক স্থানের নাম যেখানে রাসুল (সাঃ) বিদায় হজ্জের পর অবস্থান করেছিলেন এবং উটের জিনগুলোকে একত্র করে তার উপর উঠে আলী ইবনে আবী তালিবের (আঃ) হাত ধরে বলেছিলেন , আমি যাদের অভিভাবক এই আলীও তাদের অভিভাবক ।
সূত্র – তরজমায়ে আসারুল বাকীয়া, পৃষ্ঠা-৪৬০ ।
এবং মাসউদী তার গ্রন্থ “আত্ তানবিহ ওয়াল আশরাফ” এ লিখেছেন , ইমাম আলীর (আঃ) সন্তানগণ ও তাঁর শীয়াগণ (অনুসারীগন) এই দিনটিকে মহান দিবস হিসেবে গণ্য করে ।
সূত্র – আত তানবীহ ওয়াল আশরাফ , পৃষ্ঠা-২২১ ।
এবং ইবনে তালহা শাফেয়ী তার গ্রন্থ “মাতালেবুস সুউল” এ লিখেছেন –
এই দিনটিকে গাদীরে খুম দিবস নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং এই দিনে ঈদ উৎসব পালন করা হয় । যেহেতু সে সময়টি এমনই সময় ছিল , রাসুল (সাঃ) নিজে হযরত আলীকে (আঃ) উচ্চ সম্মানে ভূষিত করেন এবং সকল মানুষের মধ্য হতে তাঁকেই কেবল এই সম্মানীত স্থানে অধিষ্ঠিত করেন ।
সূত্র – মাতালেবুস সুউল , পৃষ্ঠা-১৬ , লাইন নং-১০ ।
সালাবী তার “সিমারুল কুলুব” গ্রন্থে লিখেছেন –
গাদীরের রাতটি ঐ রাত যে রাতের পরের দিন রাসুল (সাঃ) গাদীরে খুমে উটের জিনের উপর উঠে খুতবা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ,
“আমি যাদের অভিভাবক এই আলীও তাদের অভিভাবক । হে আল্লাহ ! যারা তাকে ভালবাসে তাকে তুমি ভালবাস । আর যারা তার সাথে শত্রুতা করে তার সাথে শত্রুতা কর ও যারা তাকে সাহায্য করে তাকে সাহায্য কর এবং যারা তাকে লাঞ্চিত করে তুমি তাকে লাঞ্চিত কর ।”
ইমাম আলীর (আঃ) শীয়াগন এই রাতকে অনেক মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করে এবং ইবাদতের মাধ্যমে তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে ।
সূত্র – সিমারুল কুলুব, পৃষ্ঠা-৬৩৬ ।
অনুরূপভাবে ইবনে খাল্লাকান মুসতানসারের ছেলে মুসতাআলী ফাতেমীর জীবনী অধ্যায়ে লিখেছেন –
ঈদে গাদীরের দিনে অর্থাৎ ১৮ই জিলহজ্জে ৪৮৭ হিজরীতে জনগণ ইমাম আলীর (আঃ) প্রতি বাইআত গ্রহন (অঙ্গীকারাবদ্ধ) করেছেন ।
সূত্র – ওয়াফিয়াতুল আয়ান , ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮০ ।
এবং মুসতানসার ফাতেমীর জীবনী অধ্যায়ে লিখেছেন –
সে বুধবার দিবাগত রাতে যখন ৪৮৭ হিজরীর জিলহজ্জ মাস শেষ হতে বার দিন বাকী ছিল তখন ইন্তেকাল করে । আর ঐ রাতটি ছিল ঈদে গাদীরের রাত অর্থাৎ ১৮ই জিলহজ্জ বা ঈদে গাদীরে খুম ।
সূত্র – ওয়াফিয়াতুল আয়ান , ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩০ ।
প্রিয় পাঠক ,
যেমনভাবে আমরা হাদিসসমূহ ও ঐতিহাসিকদের বিবরণে লক্ষ্য করলাম যে , গাদীর দিবসটি রাসুলের (সাঃ) জীবনের শেষ বছরে অর্থাৎ যে বছরে আলীকে (আঃ) খেলাফতে অধিষ্টিত করেন সেই বছরেই ঈদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং সেই বছর ও সেই মরুভূমি থেকে যুগ যুগ ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুমিন মুসলমানদের মাঝে এবং ইসলামী দেশসমূহে এই ঈদ জীবন্ত হয়ে রয়েছে ।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে , এই দিনটি ইমাম সাদিকের (আঃ) (শাহাদাত ১৪৮ হিঃ) যুগে , ইমাম রেযার (আঃ) (শাহাদাত-২০৩ হিঃ) যুগে , ইমাম মাহদীর (আঃ) গুপ্তকালীন অন্তর্ধানের (গায়বাতে ছোগরা) যুগ ।
অর্থাৎ যে সময় ফুরাত ইবনে ইব্রাহিম কুফী ও কুলাইনী রাজী জন্ম নিয়েছিলেন সে যুগে , মাসউদীর (মৃত্যুঃ ৩৪৫হিঃ) যুগে , সালাবী নিশাবুরীরু (মৃত্যুঃ ৪২৯হিঃ) যুগে , আবু রাইহান বিরুনীর (মৃত্যুঃ ৪৩০হিঃ) যুগে , ইবনে তালহা শাফেয়ীর (মৃত্যু ৬৫৪ হিঃ) যুগে এবং ইবনে খাল্লাকানের (মৃত্যুঃ ৬৮১ হিঃ) যুগে ঈদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল ।
ভৌগলিক বিস্তৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রাচ্যে অর্থাৎ মধ্য এশিয়ার যে অঞ্চলে আবু রাইহান জন্মলাভ করেছিলেন , নিশাবুর যেখানে সালাবী জন্মলাভ করেছিলেন , এই সব স্থান হতে রেই যেখানে কুলাইনী জন্মলাভ করেছিলেন এবং শায়িত আছেন , বাগদাদ যেখানে মাসউদী জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ও বড় হয়েছিলেন , হালাব যেখানে ইবনে তালহা জীবন যাপন করেছেন ও মৃত্যু বরণ করেছেন এবং মিশর যেখানে ইবনে খাল্লাকান জীবন অতিবাহিত করেন এবং ইহলোক ত্যাগ করেন এ সকল স্থানের জনগণ এই ঈদ সম্পর্কে ওয়াকেফহাল ছিলেন এবং এই দিবসটিকে ঈদ হিসেবেই পালন করতেন ।
এটা এমনি এক অবস্থায় যে , যদি মনেও করি এই মহান ব্যক্তিগণ প্রত্যেকেই তাদের স্বীয় এলাকায় অবস্থান করে এ বিষয়ে খবর প্রদান করেছেন । তারপরেও আমরা জানি যে , তাদের মধ্যে অনেকেই যেমন- মাসউদী ও বিরুনী বেশীরভাগ মুসলিম দেশ সফর করেছেন ।
দ্বিতীয়তঃ তাদের লিখিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে এই দিনটিকে তারা মুমিন মুসলমানদের ঈদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ।
আশাকরি ইতিহাসে লুকিয়ে ফেলা “ঈদে গাদীর” সম্বন্ধে বিস্তারিত অবগত হলেন ।
পৃথিবীর সকল মুমিন মুসলমানদের প্রতি ঈদে গাদীরের শুভেচ্ছা জানিয়ে আজকের মত বিদায় ।
শেয়ার করুন