একটি মহান আধ্যাত্মিক সফর —
মদীনা থেকে কারবালা ।
পর্ব – ০৩ ।
লেখাটি শুরুর পূর্বে দুটি কথা পাঠকদের উদ্দেশ্য বিনীত নিবেদন এই যে ,
আমি সহ আমরা অনেকেই কারবালা ঘটনার পূর্নাঙ্গ সঠিক ইতিহাস জানি না ।
তবে কথা দিলাম যে ,
পর্বগুলি ধৈর্য সহকারে পড়ুন , অনেক অজানা ঘটনা জানতে পারবেন , ইনশা আল্লাহ ।
বিশেষ করে ইমাম হোসেন (আঃ) কবে কোন তারিখে সংগী সাথী এবং পরিবার পরিজন নিয়ে ইরাকের কুফা নগরীর উদ্দেশ্যে প্রিয় জন্মভূমি মদীনা ছেড়ে রওয়ানা হলেন ।
দীর্ঘ এই সফরে পথিমধ্যে ওনাদেরকে কারা কিভাবে কারবালা নামক স্থানে এনে চর্তুদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলেছিল ।
ওনারা তখন না পারছিলেন সামনে অগ্রসর হতে , না পারছিলেন অন্য কোথাও চলে যেতে ।
শর্ত দেওয়া হয়েছিল – হয় ঈয়াযীদের প্রতি আনুগত্য বা বাইয়াত গ্রহন কর নতুবা মৃত্যুকে বেছে নাও !
কুফা নগরীতে যাওয়ার জন্য ইমাম হোসেন (আঃ) তার সংগী সাথী এবং পরিবার পরিজন নিয়ে ২৮শে রজব ৬০ হিজরীতে মদীনা ত্যাগ করেন । ওনাদের যখন কারাবাল নামক স্থানে এনে চর্তুদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলা হল সেদিনটি ছিল ০৩রা মহরম ৬১ হিজরী ।
দীর্ঘ এই সফরে ইমাম হোসেন (আঃ) এর কাফেলা কোন কোন এলাকা অতিক্রম করেছিলেন এবং ঐ সকল এলাকাতে সংঘটত বিশেষ বিশেষ ঘটনা সমূহ এই লেখাতে সংক্ষিপ্ত ভাবে বর্ননা কর হল ।
লেখাটি অত্যন্ত দীর্ঘ হওয়াতে বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক পর্বে দেয়া হল ।
আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব ।
যারুদ –
সোমবার , ২১শে জিলহজ্ব , ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আঃ) যারুদ নামক স্থানে পৌছান ।
যোহাইর বিন ক্বাইন যে ছিল উসমানী চিন্তাধারী ব্যাক্তি যে উক্ত বছরে মক্কা থেকে হজ্ব সম্পাদনের পরে কুফার দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল । যদিও প্রথমে সে ইমাম (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতে চাইনি । কিন্তু ঘটনাক্রমে উক্ত স্থানে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর সাথে তার সাক্ষাত হয়ে যায় ।
যখন যোহাইর তার লোকজনদের সাথে খাবার খাচ্ছিল তখন ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁর বার্তা বাহকের মাধ্যমে যোহাইর কে ডেকে পাঠায় । তখন যোহাইর একটু চিন্তা করে । যোহাইরের চিন্তিত চেহারা দেখে স্ত্রী বলল যে , সুবহান আল্লাহ ! তোমার কত সৌভাগ্য যে রাসুল (সাঃ) এর নাতী তোমাকে দাওয়াত দিয়েছে আর তুমি তা কবুল করবে না !
একথা শুনে কালবিলম্ব না করে যোহাইর ইমাম হোসেনের (আঃ) সাথে যোগদান করে ।
পরবর্তীতে যোহাইর এর শাহাদাতের পরে ইমাম হুসাইন (আঃ) বলেন , হে যোহাইর ! খোদা নিজের দয়া রহমত তোমার চারিদিকে দান করেছেন এবং তোমার হত্যাকারীকে অভিশপ্ত করা হয়েছে ।
সাআলাবিইয়া –
মঙ্গলবার , ২২ জিলজৃহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আঃ) সাআলাবিইয়াতে পৌছান ।
ইমাম (আঃ) রাতে উক্ত স্থানে পৌছান এবং এখানেই মুসলিম বিন আক্বিল এং হানী বিন উরওয়ার মর্মান্তিক শাহাদতের খবর তিনি শুনতে পান ।
তখন ইমাম (আঃ) বলেন , (اِنّا لِلّه وَ اِنّا اِلَيهِ راجِعون) হয়তো এরা (কুফাবাসীরা) আমার কোন উপকারেই আসবে না ।
এই বলে ইমাম হোসেন (আঃ) ক্রন্দন শুরু করেন এবং তাঁর সফরসঙ্গীরাও তার সাথে কাঁদতে শুরু করে ।
ইতিহাসে বলে হয়েছে যে , ইমাম (আঃ) তাঁর সফর সঙ্গীদের কাছে নিজের হুজ্জাত সম্পূর্ণ করেন এবং যারা পার্থিব সম্পদের জন্য এসেছিল তারা উক্ত খবরটি শুনার সাথে সাথে ইমাম (আঃ) কে ছেড়ে চলে যায় ।
যোবালে –
বুধবার, ২৩ জিলহজ্ব , ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আঃ) যোবালে নামক স্থানে পৌছান ।
ইমাম (আঃ) উক্ত স্থানে বলেন , কুফাবাসীরা আমার সাথে তাদের কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করেছে এবং আমাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে । তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ফিরে যেতে চাও তাহলে সে ফিরে যেতে পারে এবং আমি আর তার জীবনের দ্বায়িত্বভার নিতে পারব না ।
বাতনুল আক্বাবা –
শুক্রবার , ২৫ জিলহজ্ব , ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আঃ) বাতনুল আক্বাবাতে পৌছান এবং তিনি বলেন , বণী উমাইয়ারা আমাকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবে না এবং যখনই তারা এরকমটি করবে তখনই খোদা তাদের উপরে এমন একজনকে কর্তৃত্ব দান করবে যে সে তাদেরকে লাঞ্ছিত করবে ।
শারাফ বা যু হুসাম –
শনিবার , ২৬ জিলহজ্ব , ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আঃ)শারাফ বা যু হুসাম নামক স্থানে পৌছান এবং সবাইকে নির্দেশ দেন যে , সবাই যেন যথেষ্ট পরিমাণ পানি সংগ্রহ করে এবং সকালেই তারা এখান থেকে রওনা হবেন ।
পথিমধ্যে প্রায় দুপুরের কাছাকাছি ইমাম হোসেন (আঃ) এবং তাঁর কাফেলা শত্রুদের সৈন্যদের সম্মুখীন হন এবং শত্রুদের আগে তারা যু হুসাম নামক স্থানে পৌছান ।
সেখানে পৌঁছে ইমাম (আঃ) নির্দেশ দেন যে , কাফেলার সাথে থাকা পানি দিয়ে অবশ্যই শত্রুদের সকল সৈন্য এবং তাদের ঘোড়াদের তৃঞ্চা নিবারণ করা হয় ।
ইমাম হুসাইন (আঃ) এর শত্রু পক্ষের সকল সৈন্যরা যোহর ও আসরের নামাজ ইমাম হুসাইন (আঃ) পিছনে আদায় করে ।
এরপরে ইমাম হোসেন (আঃ) শত্রুদেরকে উদ্দেশ্যে করে বক্তব্য রাখেন । যখন ইমাম (আঃ) সেখান থেকে চলে যেতে চান তখন হুর বাধা হয়ে দাড়ায় ।
হুর কিছুতেই ইমাম হোসেন (আঃ) এবং তাঁর কাফেলাকে ইমামের (আঃ) পছন্দ মত গন্তব্যে যেতে দেবে না ।
ইমাম হোসেন (আঃ) তখন হুরকে বলেন , তোমার মা যেন তোমার মৃত্যুতে শোকাহত হোক ! তুমি আমার কাছে কি চাও ?
হুর বলে , আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি আপনাকে উবাইদুল্লাহর কাছে নিয়ে যাই । আর যদি আপনি তা না মেনে নেন তাহলে এমন এক পথ নির্বাচন করুন যেন তা মদীনার দিকে না হয় বরং তা কুফার দিকে হয় ।
তারপরে সেখানে ইমামের (আঃ) সাথে হুরের আরও কিছু কথা হয় ।
তৃতীয় পর্বের সমাপ্তি ।
আগামী ৪র্থ পর্বে থাকছে বায়াযে নামক স্থানের ঘটনা সমূহ ,
ইনশা আল্লাহ ।
প্রিয় পাঠক ,
এই লেখাটি যদি আপনাদের ভাল লাগে দয়া করে অবশ্যই জানাবেন ।
কেননা আপনার আগ্রহের উপর নির্ভর করছে ৩য় পর্ব ।
ততক্ষনে ভাল ও সুস্থ থাকুন ।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 1 =