কারবালার সর্বপ্রথম শহীদ —
হযরত মুসলিম ইবনে আকিলের (আঃ) শাহাদত ।

সংক্ষিপ্ত পরিচয় –
নাম – হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (আঃ) ।
পিতার নাম – হযরত আকিল ইবনে ইমরান ওরফে আবু তালিব ।
জন্ম সাল – ৩২ হিজরী ,
জন্ম স্থান – মদীনা ,
জীবনকাল – ২৮ বছর ,
শাহাদাত তারিখ – ৯ই জিলহজ্ব , ৬০ হিজরী , ১০ই সেপ্টেম্বর , ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দ ,
সমাহিত স্থান – কুফা , ইরাক ।

খুবই সংক্ষিপ্ত বিবরন —-
৬০ হিজরীর নয়ই জিলহজ্ব আমিরুল মুমিনিন হযরত আলীর (আঃ) ভাতিজা ও ইমাম হোসাইনের (আঃ) আপন চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (রাঃ) কুফায় অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে শাহাদতবরন করেন ।
কারবালার সর্বপ্রথম শহীদের বেদনা বিধুর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে সকলের প্রতি রইল আন্তরিক শোক ও সমবেদনা ।

মুয়াবীয়া ইবনে আবু সুফিয়ান হিজরী ৬০ সালের রজব মাসে মারা যায় । মৃত্যুকালে সে ইমাম হোসেনের (আঃ) সাথে লিখিত সন্ধি চুক্তি একতরফাভাবে ভঙ্গ করে স্বীয়পুত্র নরাধম জারজ ঈয়াযীদকে মুসলিম বিশ্বের খলীফা নিযুক্ত করে ।
সঙ্গত কারনে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) পাপিষ্ঠ নরাধম ঈয়াযীদের হাতে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান ।
কুফাবাসীরা হযরত হোসাইনের (আঃ) মক্কা আগমন এবং ঈয়াযীদের হাতে বাইআত গ্রহণে তার অস্বীকৃতির খবর জানত । এ খবর পেয়েই তারা সুলাইমান ইবনে সা’দ খাজায়ীর ঘরে সমবেত হয় । সমাবেশে সুলাইমান ইবনে সা’দ দাড়িয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন । বক্তব্য শেষে তিনি বলেন “ওহে আলীর অনুসারীরা ! তোমরা সবাই শুনেছ যে , মুয়াবীয়া মরে গেছে এবং নিজের হিসাব কিতাবের জন্য আল্লাহর দরবারে পৌছে গেছে । তার কৃতকর্মের ফল সে পাবে । তার ছেলে ঈয়াযীদ এখন ক্ষমতায় বসেছে । আপনারা আরও জানেন যে ,হোসাইন ইবনে আলী (আঃ) তার সাথে বিরোধীতা করেছেন এবং তিনি উমাইয়ার জালিম ও খোদাদ্রোহীদের দূরাচার থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন । তোমরা তাঁর পিতার শীয়া বা অনুসারী । হোসাইন (আঃ) আজ তোমাদের সমর্থন ও সহযোগিতার মুখাপেক্ষী । যদি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হও যে , তাঁকে সাহায্য করবে এবং তাঁর দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে , তাহলে লিখিত আকারে নিজের প্রস্তুতির কথা তাঁকে জানিয়ে দাও । যদি ভয় পাও এবং আশংকা কর যে , তোমাদের মধ্যে গাফলতি ও দুর্বলতা প্রকাশ পাবে , তাহলেও তাঁকে জানিয়ে দাও , তাঁকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও । তাঁকে ধোঁকা দিও না ।”

এরপর সে একটি পত্র লিখে পাঠিয়ে দিল । দুইদিন অপেক্ষার পর আর একদল লোককে প্রায় ১৫টি চিঠি নিয়ে হযরত ইমাম হোসাইনের (আঃ) কাছে পাঠিয়ে দিল । ঐ সব চিঠির প্রত্যেকটিতে দুই কি তিন বা চার জনের স্বাক্ষর ছিল ।
কিন্তু হোসাইন (আঃ) এত সব চিঠিপত্র পাওয়ার পরও নীরব রইলেন তাদের কোন পত্রের উত্তর দিলেন না । এমন কি মাত্র এক দিনেই ৩০০ টি চিঠি এসে তাঁর হাতে পৌছে । এরপরও পর্যায়ক্রমে একের পর এক চিঠি আসছিল । চিঠির সংখ্যা ১২হাজার ছাড়িয়ে যায় । সর্বশেষ যে চিঠিখানা তাঁর হাতে এসে পৌছে তা ছিল হানি ইবনে হানি ছবিয়ী এবং সায়ীদ ইবনে আব্দুল্লাহ হানাফীর । তারা উভয়ে ছিল কুফার অধিবাসী। চিঠি পাওয়ার পর পত্র বাহক দু’জনের কাছে হোসাইন ইবনে আলী (আঃ) জিজ্ঞেস করেন – এ চিঠিগুলো কে কে লিখেছে ?
তারা বলল , হে আল্লাহর রাসুলের সন্তান ! পত্রের লেখকরা হলেন-শাব্স ইবনে রাবায়ী ,হাজার ইবনে আবজার , ইয়াজিদ ইবনে হারেছ , ইয়াজিদ ইবনে রোয়াম ,উরওয়া ইবনে কাইছ ,আমর ইবনে হাজ্জাজ এবং মুহাম্মদ ইবনে ওমর ইবনে আতারেদ ।
এরুপ পরিস্থিতিতে হোসাইন ইবনে আলী (আঃ)একদিন কাবাঘরের পাশে গিয়ে রুকন ও মাকামে ইব্রাহীমের মাঝখানে দাড়িয়ে দুই রাকত নামায আদায় এবং মহান আল্লাহর দরবারে পরিস্থিতির কল্যাণকর পরিণতির জন্য দোয়া করেন । অতঃপর চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ডেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন ।

এরপর ইমাম হোসাইন (আঃ) কুফাবাসীর চিঠির জবাব লিখে মুসলিম ইবনে আকিলের মাধ্যমে প্রেরণ করেন ।
জবাবী পত্রে তাদের আমন্ত্রণ কবুলের ওয়াদা দিয়ে লেখা ছিল –
আমি আমার চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিলকে তোমাদের কাছে পাঠালাম যাতে তোমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ করে সে সম্পর্কে আমাকে অবহিত করে ।

ইমাম হোসেনের (আঃ) পত্র নিয়ে হযরত মুসলিম কুফায় আসেন । কুফাবাসী হোসাইন ইবনে আলী (আঃ) ও মুসলিম ইবনে আকিলকে পেয়ে আনন্দিত হল । তাকে মুখতার ইবনে আবী ওবায়দা সাকাফীর বাড়িতে থাকতে দিলেন । অনুসারীরা দলে দলে মুসলিম ইবনে আকিলের সাথে সাক্ষাত করতে আসতে লাগল । প্রত্যেক দল আসার সাথে সাথে মুসলিম ইমামের (আঃ) পত্র পড়ে শুনাতে থাকেন ।
আনন্দে দর্শনার্থীদের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করছিল । দেখতে দেখতে আঠারশো লোক তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে ।

এদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম বাহেলী ,এমারা ইবনে ওয়ালীদ এবং ওমর ইবনে সাআদ ঈয়াযীদের কাছে এক পত্র পাঠিয়ে কুফা শহরে মুসলিম ইবনে আকিলের আগমন সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন ।
ঐ পত্রে নোমান ইবনে বশীরকে কুফার গভর্ণরের পদ থেকে সরিয়ে ইবনে যিয়াদকে নিয়োগ দানের করে । ঐ পত্রে মুসলিম ও হোসাইনের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে বিবরণ দেয় । পত্রে কড়া নির্দেশ প্রদান করে যে , যে কোন মূল্যে মুসলিমকে গ্রেফতার ও হত্যা কর । ইবনে যিয়াদ চিঠি পাওয়ার পর কুফা গমনের উদ্দেশ্যে তৈরী হয়ে যায় ।

হযরত মুসলিম ইবনে আকিল এই সংবাদ শুনে ভয় পেলেন । হয়তো ইবনে যিয়াদ তার কুফা অবস্থানের সংবাদ জেনে ফেলতে পারে । এমনকি তার অনিষ্ট সাধন করতে পারে এজন্যে তিনি মুখতারের ঘর থেকে এসে হানি ইবনে উরওয়ার ঘরে আশ্রয় নেন ।
হানি ইবনে উরওয়া তাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিলেন । মুসলিম ইবনে আকিলকে আশ্রয়দেয়ার অপরাধে ইবনে যিয়াদ হানি ইবনে উরওয়কে নির্মমভাবে হত্যা করে ।
হানির নিহত হওয়ার সংবাদ মুসলিম ইবনে আকিলের কাছে পৌছালে যত লোক তার হাতে বাইআত করেছিল , তাদের সহ তিনি ইবনে যিয়াদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হন ।
ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ এ সময় দারুল ইমারায় আশ্রয় নেয় এবং প্রাসাদের ভিতরে ঢোকার সবগুলো দরজা বন্ধ করে দেয় । তার দলীয় লোকেরা মুসলিমের সঙ্গী সাথীদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় । আর যারা যিয়াদের সাথে দারুল ইমারার (প্রাসাদ) ভেতরে ছিল তারা মুসলিমের বাহিনীকে সিরিয়া থেকে সৈন্য বাহিনী আসার হুমকি দিচ্ছিল ।
ঐ দিন এভাবেই কেটে গেল এবং রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এল । কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের মিথ্যা প্রলোভনে প্রতারিত হয়ে বেশির ভাগ মানুষই ইমামের (আঃ) প্রতিনিধিকে (মুসলিমকে) ত্যাগ করেন । মুসলিমের সঙ্গী সাথীরা ধীরে ধীরে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল । পরস্পর বলাবলি করতে লাগল আমরা কেন গোলযোগ আর বিশৃংখলার আগুন জ্বালাচ্ছি । আমাদের তো উচিৎ ঘরে বসে থাকা আর মুসলিম ও ইবনে যিয়াদের ব্যাপারে নিজেকে না জড়ানো । আল্লাহই তাদের মধ্যে সমাধান করে দিবেন ।
এভাবে সবাই চলে গেল শেষ পর্যন্ত ১০ জন লোক ছাড়া আর কেউই মুসলিমের সাথে রইল না । এবার তিনি মসজিদে এসে মাগরিবের নামাজ পড়লেন । নামাজের পর দেখলেন ঐ দশ জনও সেখানে নেই ।
তিনি অত্যন্ত অসহায়ভাবে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন । অলিগলির পথ চলতে চলতে তিনি ‘তাওয়া’ নাম্নী এক মহিলার ঘরে এসে পানি চাইলেন । মহিলা পানি দিলে তা তিনি পান করলেন এবং মুসলিমকে আশ্রয় দিলেন ।
কিন্তু তার ছেলে গিয়ে ইবনে যিয়াদকে ব্যপারটা জানিয়ে দিল । ইবনে যিয়াদ মুহাম্মদ ইবনে আশআসকে একদল লোক সহ মুসলিমকে গ্রেফতারের জন্য পাঠাল । মুসলিম তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলেন এবং তাদের সাথে একাই যুদ্ধে লিপ্ত হলেন ও তাদের বেশ কিছু লোককে হত্যা করলেন ।
আশআস চিৎকার দিয়ে বলল – হে মুসলিম আমরা তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি । মুসলিম বললেন- ধোকাবাজ ,ফাসেক লোকদের নিরাপত্তা দেয়ার কোন দাম নেই ।
যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে মুসলিমের ঢাল ও তরবারী ভেঙ্গে যাওয়ায় তার মনোবল কিছুটা দূর্বল হয়ে যায় (এত গুলো মানুষের সাথে একাই তাও আবার ভাঙ্গা ঢাল ও তরবারী নিয়ে ) ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি পিছন থেকে তীরের সাহায্যে আঘাত করলে তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যান । তখন তাকে বন্দী করে ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় ।
ইবনে যিয়াদ বকর ইবনে হামারানকে দারুল ইমারার ছাদের উপর মুসলিমকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার নির্দেশ দিল ।
মুসলিম যাওয়ার সময় তাছবীহ পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন । ইমারতের ছাদের উপর পৌছা পর্যন্ত তিনি রাসূলের (সাঃ) উপর দরুদ পাঠ করতে থাকলেন ।

ছাদের কিনারায় তাঁকে দুই হাত বাঁধা অবস্থায় দাড় করানো হল । বিষাক্ত তরবারী দিয়ে পিপাসার্ত অবস্থায় তাঁর মাথা দেহ থেকে আলাদা করে তাঁকে উঁচু ছাদ থেকে নীচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হল ।

এভাবেই ইমাম হোসেনের (আঃ) দূত হযরত মুসলিম ইবনে আকিলকে (আঃ) পিপাসার্ত অবস্থায় শহীদ করা হয়েছিল ।
কারবালার সর্বপ্রথম শহীদ হযরত মুসলিম ইবনে আকিলের (আঃ) প্রতি রইল সালাম ।
সালামুন আলাইকা ইয়া মজলুম মুসলিম ইবনে আকিল ।

বিঃদ্রঃ – মুসলিম ইবনে আকিলের (আঃ) শাহাদাতের বিস্তারিত ঘটনা সমূহের উপর ইরান কতৃক নির্মিত উর্দু ডাবিংসহ ছবিটি দেখুন এবং অজানা ইতিহাস সম্বন্ধে জানুন ।

 

Image may contain: 3 people, text
শেয়ার করুন