কারবালা প্রান্তরের মর্মান্তিক নিষ্ঠুর মুহূর্তগুলো এবং একটি বিবাহ প্রসঙ্গ ।

ভারতীয় উপমহাদেশে এই ঘটনাটির কথা বহুল প্রচারিত যে , কারবালা প্রান্তরে মর্মান্তিক নিষ্ঠুর বেদনাবিধূর দিনগুলিতে অর্থাৎ দশই মহরমের কয়েকটি দিন পূর্বে ষষ্ঠ বা সপ্তম মহরম দিবসে মজলুম ইমাম হোসেনের (আঃ) কন্যার সাথে দ্বিতীয় ইমাম হযরত হাসানের (আঃ) পুত্র হযরত কাসিমের (আঃ) সাথে শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল ।
ঐতিহাসিক এই ঘটনাটির সত্যতা নিয়েই আজকের এই লেখাটির সূত্রপাত ।

প্রথমেই বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে , ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি সম্বন্ধে ইতিহাস থেকে শক্ত মজবুত কোন দলীল-প্রমান পাওয়া যায় না ।
তৎকালীন সময় কারবালা প্রান্তরে নিষ্ঠুর মুহূর্তের সময়গুলোতে হযরত কাসিমের (আঃ) সাথে হযরত ইমাম হোসেনের (আঃ) কন্যার বিবাহের ঘটনা হচ্ছে ইসলামের শত্রুদের একটি রটনা এবং ষড়যন্ত্র ।
কারবালার মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতাকে লোকচক্ষুর অন্তরাল করার অপচেষ্টার হীন প্রয়াস হিসাবে কাল্পনিক অবাস্তব বিবাহের ঘটনাকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছে ।
বাস্তবতা এটাই যে , এ সম্পর্কে কোন সঠিক রেওয়ায়েত বিশ্বস্ত পুস্তক সমূহে লিপিবদ্ধ নাই ।

মূল প্রসঙ্গে চলুন ।
ইতিহাসে পাওয়া যায় যে , মজলুম ইমাম হযরত হোসেনের (আঃ) তিনজন কন্যা ছিল ।
হযরত ফাতিমা সুগরা (সাঃআঃ) , হযরত ফাতিমা (সাঃআঃ) এবং হযরত সকিনা (সাঃআঃ) ।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শেখ তাবারসীর মতে হযরত সাকিনা (সাঃআঃ) , যাকে দ্বিতীয় ইমাম হযরত হাসান (আঃ) তাঁর সন্তান আব্দুল্লাহ বিন হাসানের সাথে বিবাহ দেন । কিন্ত কন্যা বিদায়ের পূর্বেই তিনি শহীদ হয়ে যান ।
এবং তৃতীয় ইমাম হযরত হোসেনের (আঃ) আরেকটি কন্য ফাতিমা যার সাথে হাসান মোসান্নার বিবাহ হয়েছিল । তিনিও কারবালাতে উপস্থিত ছিলেন ।
ইমাম হোসেনের (আঃ) তৃতীয় কন্যা হযরত ফাতিমা সুগরা যিনি কারবালায় ছিলেন না । বরং তিনি কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার সময় মদীনায় ছিলেন ।

অতএব ইমাম হোসেনের (আঃ) আর কোন কন্যা ছিল না যে তার সাথে হযরত কাসিমের (আঃ) বিবাহ দিবেন ।

মোহাদ্দেসে নূরী তার লুলু ওয়া মারজান নামক গ্রন্থে এবং অন্যান্য বিশ্বস্ত গ্রন্থ সমূহে যেমন হাদীস , সীরাহ এবং বংশধারা বিশেষজ্ঞদের মতে ইমাম হোসেনের (আঃ) এমন কোন কন্যা ছিল না যার কারবালার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিবাহ হয় নাই ।
অর্থাৎ কারবালার ঘটনার পূর্বেই ইমাম হোসেনের (আঃ) তিনজন কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল ।

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার সময় হযরত কাসিমের (আঃ) বয়স পনের বছরের কম ছিল । তাবারীর মতে তখন হযরত কাসিমের (আঃ) বয়স ছিল দশ বছর এবং মাকতালে আবু মাখনাফে বর্ণিত হয়েছে যে , হযরত কাসিমের (আঃ) বয়স ছিল ১৪ বছর । মোটকথা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার সময় হযরত কাসিমের (আঃ) বয়স দশ থেকে চোদ্দ বছরের মধ্যে ছিল ।
সূত্র – মুনতাখাবে তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা – ২৬৬ ।

আল্লামা মাজলিসীর মতে কারবালা প্রান্তরে হযরত কাসিমের (আঃ) বিবাহের ঘটনার কোন বিশ্বস্ত মজবুত দলীল-প্রমান নাই ।

হযরত হোসেনের (আঃ) কন্যাদের বিবাহ সম্পর্কিত ঘটনা সম্বন্ধে মাত্র দুইটি পুস্তকে যা পাওয়া যায় তা নিন্মরূপ —

১) – মাজমাউল বাহরাইন , লেখক শেইখ ফাখরুদ্দিন তুরাইহী ।
২) – রওযাতুশ শোহাদা , লেখক মোল্লা হুসাইন কাসেফী ।
উক্ত পুস্তকটি প্রথম কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা একটি বই যা ফার্সি ভাষায় লেখা হয়েছে ।
রিয়াযুল মোকাদ্দাস আল মোসামমা বে হাদায়েক্বেল উনস, মরহুম সদর উদ্দিন ওয়ায়েয কাযওয়িনি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২ ।

উক্ত বইটিতে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয়েছে যে , যখন ইমাম হোসেন (আঃ) মদীনা থেকে কারবালা অভিমুখে রওয়ানা হচ্ছিলেন তখন হাসান বিন হাসান তার চাচা হোসেনের (আঃ) কাছে তাঁর দুই কন্যার মধ্যে থেকে একজনের সাথে বিবাহের প্রস্তাব দেন ।
ইমাম হোসেন (আঃ) তাঁর ভাতিজাকে বলেন , তুমি যাকে বেশী পছন্দ কর তাকে নির্বাচন কর ।
তখন হাসান বিন হাসান লজ্জা পান এবং কিছুই বলেন না ।
ইমাম হোসেন (আঃ) বলেন , আমি তোমার জন্য আমার কন্যা ফাতিমাকে নির্বাচন করলাম যে আমার মা ফাতিমার সাথে অনেক মিল রয়েছে ।

এটাই হচ্ছে হযরত কাসিমের (আঃ) বিবাহের ভুল ঘটনা যা ইতিহাসে বিকৃত করা হয়েছে ।
তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে , হযরত কাসিমের (আঃ) বিবাহের ঘটনাটা সত্যি ! তাহলে বলতে হবে যে , ইমাম হোসেনের (আঃ) দুইটি কন্যা ছিল । এক ফাতিমা যার সাথে হাসান বিন হাসানের বিবাহ হয় এবং অপর কন্যার সাথে হযরত কাসিমের বিবাহ হয় ।
অথবা বিষয়টি এমনও হতে পারে , যে কন্যার সাথে হযরত কাসিমের বিবাহ হয় তার নাম ফাতিমা ছিল না এবং ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী তা ভুল উল্লেখ করা হয়েছে ।
যদি উক্ত ঘটনাকে সত্যি বলে গ্রহন না করি তাহলে আমরা বলতে পারব যে , ইতিহাসবিদরা হাসানের নামের স্থানে ভুল করে কাসিমের নাম উল্লেখ করেছেন ।
এমতাবস্থায় বেশীরভাগ কারবালার ঘটনা বর্ণনাকারীদের দৃষ্টিতে কারবালা প্রান্তরে হযরত কাসিমের (আঃ) বিবাহের ঘটনাকে ভুল বা ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন ।

এখানে উল্লেখ্য যে , মোহাদ্দেস কুম্মী মুনতাহিউল আমালে এবং নাফসুল মাহমুম নামক গ্রন্থে হযরত কাসিমের বিবাহের ঘটনাকে অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে , লেখকগন ভুলবশত হাসান বিন হাসানের নামের স্থানে হযরত কাসিমের নাম উল্লেখ করেছেন ।

বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় যে , বিশেষ করে ষষ্ঠ বা সপ্তম মহরম দিবস থেকে কারবালা প্রান্তরে কুলাঙ্গার ঈয়াযীদের নরপিশাচ সৈন্যদল ইমাম হোসেনের (আঃ) তাবুগুলোতে পানি সরবরাহ সম্পূর্নরুপে বন্ধ করে দিয়েছিল । তাবুগুলোতে অবস্থানরত ছোট ছোট শিশুরা পানির তৃষ্ণায় ছটফট করছিল । কারবালা প্রান্তরে প্রচন্ড গরমে মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল ।
দিনগুলি এমনই ভয়াবহ ছিল যে , শান্ত স্থির হয়ে ইমাম হোসেন (আঃ) তাঁর সাথীদের নিয়ে নামাজ আদায় করতে পারছিলেন না ।
ইমামের (আঃ) কতিপয় সাহাবী নামাজের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন যাতে করে ইমাম (আঃ) অন্য সাহাবীদের নিয়ে জামাত সহকারে নামাজ আদায় করতে পারেন । শত্রুদের অজস্র তীর নিক্ষেপের মধ্যেই ইমাম হোসেনকে (আঃ) নামাজ আদায় করতে হয়েছে । যে সকল সাহাবীরা নামাজের সামনে ঢাল হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের অনেকর বুকে তীর এসে আঘাত করেছিল এবং ওনারা তখনই শহীদ হয়েছিলেন ।
তাবুগুলোতে একফোঁটা পানি নাই ।
শিশুরা পানির জন্য হাহাকার করছিল । আল-আতাস , আল-আতাস — শিশুদের আর্তচীৎকারে মরুভূমির তপ্ত পরিবেশ অত্যন্ত শোকাবহ হয়ে পড়েছিল ।
এরমধ্যে চারিদিকে কুলাঙ্গার ঈয়াযীদের নরপিশাচ সৈন্যদের বিরতিহীন তীর-বর্শা নিক্ষেপ চলছেই ।
এরকম ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে কিভাবে সম্ভব যে , ইমাম হোসেন (আঃ) বিবাহের মতো এক আনন্দময় পরিবেশ গড়ে তুলবেন !
সবথেকে বড় কথা হল যে , হযরত কাসিমের (আঃ) এই বিবাহের ঘটনাটি কোন বিশ্বস্ত ইতিহাসের পুস্তকে লিপিবদ্ধ নাই ।
সূত্র – হামাসে হুসাইনী, খন্ড ১, পৃষ্ঠা – ২৭, ২৮ ।

এছাড়া বিখ্যাত ইতিহাসবিদ শহীদ মোর্তযা মোতাহহারীও নিজেও হযরত কাসিমের বিবাহের ঘটনাটি অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে , কোন বিশ্বস্ত গ্রন্থ সমূহে এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় নাই । এবং উক্ত ঘটনার কোন সত্যতা নাই ।
সূত্র – হামাসে হুসাইনী , মোর্তজা মোতাহহারী, খন্ড ১, পৃ ২৮।

আশাকরি বহুদিনের প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ঘটনা থেকে মুক্ত হলেন ।

শেয়ার করুন