শোক-ক্রন্দন —
আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের জন্য ক্রন্দন জায়েয হওয়ার স্বপক্ষে দলীল ।
১) – শোক-ক্রন্দনের স্বপক্ষে দলীল – সহীহ হাদিস ও ঐতিহাসিক গ্রন্থসমূহ অধ্যয়নে আমরা দেখি যে , দ্বীনের ধারক-বাহকগন আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের শোকে ক্রন্দন করেছেন ।
এখানে সংক্ষিপ্ত কিছু দলীল তুলে ধরছি ।
ক) –
তাবারী নিজ সূত্রে হযরত আলী (আঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি বলেছেন ,‘যখন কাবিল স্বীয় ভ্রাতা হাবিলকে হত্যা করে তখন হযরত আদম (আঃ) তার শোকে ক্রন্দন করেছেন ।’
সূত্র – সীরাতে হালাবী ,২য় খন্ড ,পৃ. ৩২৩।
খ) –
তাবারী বর্ণনা করেছেন ,‘ হযরত ইয়াকুব (আঃ) এবং হযরত ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছিন্ন থাকার সময়কাল ছিল দীর্ঘ চল্লিশ বছর । এই চল্লিশ বছর হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্র হযরত ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছেদের বেদনায় ক্রন্দন করেছেন ।’
সূত্র – তারিখে তাবারী ,১ম খন্ড ,পৃ. ৩৭ ।
গ) –
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন , “আমরা রাসূলকে (সাঃ) শহীদ হামজার (রাঃ) শাহাদাতের দিনের ন্যায় ক্রন্দন করতে আর কখনই দেখি নাই ।”
সূত্র – তারিখে তাবারী,১৩তম খন্ড ,পৃ. ৩২।
৪) — ইবনে আবি শাইবা স্বীয় সূত্রে ইবনে মাসউদ হতে বর্ণনা করেছেন , “একদিন আমরা রাসূলের (সাঃ) নিকট বসেছিলাম । হঠাৎ বনী হাশিমের একদল নারী-পুরুষ সেখানে আসল । মহানবী (সাঃ) তাদেরকে দেখামাত্রই কাঁদতে শুরু করলেন এবং তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেল ।
সাহাবীরা প্রশ্ন করলেন , হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! কেন আপনার চেহারায় বিষন্নতা লক্ষ্য করছি ?
মহানবী (সাঃ) বললেন , “আমরা এমনই এক বংশ যাদের আখেরাতকে আল্লাহ দুনিয়ার উপর প্রাধান্য দিয়েছেন । সেদিন খুব বেশী দূরে নয় , আমার আহলে বাইতের উপর বিপদাপদ ও নির্বাসনের চরম দুর্যোগ নেমে আসবে ।’ সূত্র – আল মুসান্নিফ , ৮ম খন্ড ,পৃ. ৬৯৭ ।
৫) – ইমাম বুখারী (রহঃ) নিজ সূত্রে বর্ণনা করেছেন , “যখন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) ,যাইদ ইবনে হারেসা এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে রওয়াহার শাহাদাতের সংবাদ রাসূলের (সাঃ) নিকট পৌঁছল তখন রাসুল (সাঃ) ক্রন্দন করেছিলেন ।’
সূত্র – সহীহ বুখারী ,২য় খন্ড ,পৃ. ২৪০ , সাহাবীদের ফজিলতের অধ্যায় ।
৬) – ইবনে আসির বর্ণনা করেছেন , “হযরত জাফর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের খবর শোনার পর রাসূল (সাঃ) জাফরের গৃহে গেলেন ও তাঁর সন্তানদের নিজের কাছে ডাকলেন । তাদের কোলে নিয়ে মুখে চুমু খেলেন ও ক্রন্দন করলেন । জাফরের স্ত্রী আসমা তাঁকে বললেন , হে নবী (সাঃ) ! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত হোক । কেন আপনি ক্রন্দন করছেন ? আপনার নিকট জাফরের কোন খবর এসেছে কি ?
মহানবী (সাঃ) বললেন , “হ্যাঁ , সে আজ শহীদ হয়েছে ।’
আসমা বলেন , “আমি গৃহের ভেতরে প্রবেশ করে মহিলাদের সাথে নিয়ে ক্রন্দন করতে লাগলাম । তখন হযরত ফাতিমা (সাঃআঃ) সেখানে আসলেন এবং ‘হে চাচা’ বলে ক্রন্দন করতে লাগলেন ।
রাসূল (সাঃ) তখন বললেন , “ক্রন্দনকারীদের উচিত জাফরের মতো ব্যক্তির জন্যই ক্রন্দন করা ।’
সূত্র – কামিল ,ইবনে আসির ,২য় খন্ড ,পৃ. ৯০ ।
৭) – ইমাম মুসলিম (রহঃ) নিজ সূত্রে হযরত আবু হুরাইরা হতে বর্ণনা করেছেন , “মহানবী (সাঃ) একদিন তাঁর মাতার কবর জিয়ারতে গেলেন এবং এতটাই কাঁদলেন যে , তাঁর পাশে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও কাঁদতে শুরু করলেন ।’
সূত্র – সহীহ মুসলিম , ২য় খন্ড ,পৃ. ৯০ ।
৮) – হাকিম নিশাবুরী নিজ সূত্রে উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশা হতে বর্ণনা করেছেন , “মহানবী (সাঃ) উসমান ইবনে মাজউনের মৃত্যুর পর তাঁকে চুম্বন করেন ও ক্রন্দন করেন ।
সূত্র – মুসতাদরাকে হাকিম , ১ম খন্ড ,পৃ. ৩৬১ ।
৯) – ইবনে মাজা আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণনা করেছেন , “মহানবী (সাঃ) তাঁর পুত্র ইবরাহীমের মৃত্যুর পর আদেশ দেন যে , তাকে না দেখানোর পূর্বে যেন কাফনে আবৃত করা না হয় । অতঃপর ইবরাহীমের মৃতদেহের নিকট এসে পুত্রের উপর উপুড় হয়ে ক্রন্দন করতে লাগলেন ।’
সূত্র – সুনানে ইবনে মাজা ,১ম খন্ড ,পৃ. ৪৭৩, কিতাবুল জানায়িয ।
১০) – ইবনে আব্বাস মালিকী ষষ্ঠ ইমাম সাদিক (আঃ) হতে বর্ণনা করেন , “হযরত ফাতিমা যাহরার (সাঃআঃ) ইন্তেকালের পর হযরত আলী (আঃ) প্রতিদিন তাঁর কবর জিয়ারতে যেতেন । একদিন জিয়ারতে গিয়ে কবরের উপর আপতিত হয়ে এ কবিতাটি পাঠ করেন ।
সূত্র – আল ইমামাহ ওয়াস সিয়াসাহ ।
مالی مررت علی القبور مسلَما
یا قبر الحبیب فلم یرد جوابی
یا قبر ما لک لا تجیب منادیا
أمللت بعدی خلّة الاحباب
১১) – ইবনে কুতাইবা বর্ণনা করেছেন , সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (আঃ) আদীকে প্রশ্ন করেন , আম্মার কি নিহত হয়েছেন ?’
তিনি বললেন , হ্যাঁ !’
তখন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন , “আল্লাহ তাঁকে রহম করুন । ’
সূত্র – আল ইমামাহ ওয়াস সিয়াসাহ ।
১২) – সিবতে ইবনে জাওযী বর্ণনা করেছেন , “যখন মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের শাহাদাতের খবর হযরত আলীর (আঃ) নিকট পৌছল তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করে ক্রন্দন করলেন এবং তাঁর হত্যাকারীর উপর লানত (অভিসম্পাত) বর্ষন করলেন ।’
সূত্র – তাযকিরাতুল খাওয়াছ ,পৃ. ১০৭ ।
১৩) – ইয়াকুবী বর্ণনা করেছেন , “হযরত খাদিজার (সাঃআঃ) ইন্তেকালের পর হযরত ফাতিমা (সাঃআঃ) রাসূলের (সাঃ) নিকট এসে ক্রন্দনরত অবস্থায় বলতে লাগলেন , “আমার মাতা কোথায় ? আমার মাতা কোথায় ?’
সূত্র – তারিখে ইয়াকুবী ,২য় খন্ড ,পৃ. ৩৫ ।
১৪) – ইবনে আবিল হাদীদ বর্ণনা করেছেন , “যে রাতে হযরত আলী (আঃ) শহীদ হন পরের দিন ভোরে ইমাম হাসান (আঃ) কুফার মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণার পর হযরত আলীর (আঃ) পরিচয় দিতে গিয়ে শোকে কণ্ঠ আড়ষ্ট হয়ে পড়লেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন ।
ফলে শ্রোতারাও হযরত আলীর (আঃ) শোকে কাঁদতে শুরু করলেন ।’
সূত্র – ইবনে আবিল হাদীদ , শারহে নাহজুল বালাগা , ৪র্থ খন্ড , পৃ ১১ ।
১৫) – কান্দুযী হানাফী হযরত আব্বাস ইবনে আলীর (আঃ) শাহাদাতের বর্ণনায় বলেন , “এক ব্যক্তি লৌহ নির্মিত বল্লম দিয়ে তাঁর পবিত্র মস্তকে আঘাত হানলে তা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং তিনি ঘোড়া হতে মাটিতে পড়ে গেলেন এবং চীৎকার করে বলেন , “হে ভ্রাতা ! হে আবা আবদিল্লাহ (আঃ) ! হে হুসাইন (আঃ) ! আপনার উপর আমার সালাম ।’
ইমাম হুসাইন (আঃ) দ্রুত তাঁর নিকট পৌঁছলেন এবং ক্রন্দনরত অবস্থায় বলতে লাগলেন , হে আমার ভ্রাতা , আব্বাস ! আমার দেহের অংশ ।’
তাঁর নিকট দণ্ডায়মান শত্রুদের সরিয়ে দিয়ে তাঁর দেহকে মাটি থেকে উঠিয়ে নিয়ে তাঁর তাঁবুর ভিতর রাখলেন ।
কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন ,‘ আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন ।’
সূত্র – ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাহ ,পৃ. ৪০৯ ।
১৬) – তিনি আরও উল্লেখ করেছেন , “হুর ইবনে ইয়াযীদ রিয়াহির শাহাদাতের পর উমর ইবনে সাদের সৈন্যরা তাঁর দেহ হতে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ইমাম হুসাইনের (আঃ) দিকে ছুঁড়ে ফেলে ।
ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁর মাথাটি কোলে নিয়ে ক্রন্দন করতে লাগলেন এবং তাঁর মুখের উপর থেকে রক্তগুলো পরিষ্কার করতে লাগলেন । অতঃপর তাঁর মস্তকের উদ্দেশে বললেন , “তোমার মাতা তোমার নাম ভুল রাখেন নাই । তুমি হুর অর্থাৎ স্বাধীন । পৃথিবীতেও তুমি স্বাধীন ছিলে , আখেরাতেও স্বাধীন ও সৌভাগ্যবান হলে ।’
সূত্র – ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাহ ,পৃ. ৪১৪ ।
১৭) – ইবনে আসাকির তাঁর সূত্রে ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম সাজ্জাদকে (আঃ) প্রশ্ন করা হল , কেন আপনি ইমাম হুসাইনের (আঃ) জন্য এত অধিক কান্নাকাটি করেন ?
ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) জবাবে বললেন :, “আমাকে এজন্য সমালোচনা করিও না । কারন হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর এক সন্তান নিখোঁজ হওয়াতে এতটাই ক্রন্দন করেন যে , তাঁর দুই চোখ সাদা হয়ে যায় । অথচ তিনি ভালমতই জানতেন যে , তাঁর সন্তান জীবিত আছেন । আর আমি আমার চোখের সামনে আমার পরিবারের চৌদ্দজন সদস্যকে জবেহ করে হত্যা করতে দেখেছি । তোমরা কি চাও , এই চরম দুঃখ-কষ্টের বিষয়টি আমার মন থেকে মুছে ফেলতে ?’
সূত্র – তারিখে দামেস্ক , ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ) জীবনী অধ্যায় ,পৃ ৫৬ ।
১৮) – সিবতে ইবনে জাওযী বলেছেন , “ইমাম হুসাইনের (আঃ) শাহাদাতের পর ইবনে আব্বাস (রাঃ) এতটা ক্রন্দন করতেন যে , তাঁর চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।’
সূত্র – তাযকিরাতুল খাওয়াছ ,পৃ. ১৫২ ।
১৯) – ইবনে আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেছেন , যায়েদ ইবনে আরকাম ইবনে যিয়াদের উদ্দেশে বলেন , “তুমি তোমার লাঠিটি হুসাইনের (আঃ) দাঁত থেকে সরাও । আল্লাহর শপথ ! আমি অসংখ্যবার লক্ষ্য করেছি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ঐ ঠোট দু’ টিতে চুম্বন করেছেন ।’
এই বলে তিনি ক্রন্দন করতে লাগলেন ।
সূত্র – উসদুল গাবাহ,২য় খন্ড ,পৃ. ২১ ।
২০) – ইবনে হাজার হাইসামী বর্ণনা করেছেন , “উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমা (রাঃ) ইমাম হুসাইনের (আঃ) শাহাদাতের খবর শুনে আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন , তারা এমন জঘন্য কাজ করেছে ? হুসাইনকে (আঃ) হত্যা করার কারনে আল্লাহ তাদের কবরকে অগ্নিতে পূর্ণ করুন ।
অতঃপর এতটাই ক্রন্দন করলেন যে , অজ্ঞান হয়ে পড়লেন ।’
সূত্র – সাওয়ায়েকে মুহরিকা ,পৃ. ১৯৬ ।
পাঠক ,
ক্রন্দন দিয়েই জীবনের সূত্রপাত ।
সকলকে ধন্যবাদ এবং সালাম জানিয়ে আজকের মত বিদায় ।
শেয়ার করুন