খাতুনে জান্নাত ফাতেমা (সাঃআঃ) এবং কবরের মাটি প্রসঙ্গ ।

সমাজে বহুল প্রচারিত আষাঢ়ের গল্প জাল ভূয়া হাদিসটি দেখে নিন ।

“খাতুনে জান্নাত ফাতেমা যাহরার (সাঃআঃ) ইন্তেকালের পরে হযরত আবু বকর মতান্তরে হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) খাতুনে জান্নাত ফাতেমা যাহরাকে (সাঃআঃ) কবরে শুইয়ে দিয়ে কবরের মাটিকে বলল , “হে মাটি , তুমি কি জান ! আজকে তোমার বুকে কাকে রেখে যাচ্ছি ? ফাতেমা (সাঃআঃ) হলো নবীকন্যা , ইমাম হাসান (আঃ) ও হোসাইনের (আঃ) মা এবং আলীর (আঃ) সহধর্মিণী । তুমি তাঁর সাথে কখনও খারাপ ব্যবহার করিও না ।”
তখন মাটির জবান খুলে গেল এবং মাটি বলল , “আমি নবীকন্যা চিনি না , আমি ইমাম হাসান ও হোসাইন এবং আলীকে চিনি না । আমি শুধু আমল চিনি । যার আমল ভাল সে ভাল থাকবে এবং যার আমল খারাপ সে খারাপ থাকবে।”

সারসংক্ষেপে এই হচ্ছে আমাদের কুখ্যাত আলেম সমাজের বয়ানকৃত জাল হাদিস ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
এবারে আমরা বহুল প্রচারিত এই মিথ্যা জাল হাদিস নিয়ে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করব ।

সর্বপ্রথমে নবীকন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা যাহরার (সাঃআঃ) অসংখ্য গুন-বৈশিষ্টের মধ্যে মাত্র তিনটি বৈশিষ্টের কথা শুনে নিন ।

নবীকন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা যাহরাকে (সাঃআঃ) জান্নাতী মহিলাদের সম্রাজ্ঞী বলা হয় ।
বিশ্বনবী (সাঃ) বলেন , “নিশ্চয়ই ফাতেমা বেহেশতের সকল নারীর নেত্রী এবং হাসান ও হোসেন বেহেশতের যুবকদের সর্দার কিন্ত তাঁদের পিতা (আলী) তাঁদেরও সর্দার ” ।
সূত্র – আল জামে আস সহীহ আত তিরমিজি , খন্ড – ৫ , পৃ- ৬৫৬ (মিশর) / আল মুসনাদ আহম্মাদ ইবনে হাম্বল , খন্ড- ৩ , পৃ- ৬২, ৬৪ (মিশর) / সুনানে ইবনে মাজা , খন্ড- ১ , পৃ- ৫৬ (মিশর) / কানজুল উম্মাল , খন্ড – ১৩ , পৃ- ১২৭ / তারিখে বাগদাদ , খন্ড – ১ , পৃ- ১৪০ / মুয়াদ্দাতুল কুরবা , পৃ- ১০৯ / আল মুস্তাদরাক হাকেম , খন্ড- ৩ , পৃ- ১৬৭ (হায়দারাবাদ) ।

মহানবী (সাঃ) স্বয়ং যাঁর সম্মানে নিজের আসন থেকে দাঁড়িয়ে যেতেন তাঁকেই ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) বলা হয় ।
উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশা থেকে বর্নিত –
‘আমি কথাবার্তা ও আলোচনায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে ফাতিমার (সাঃআঃ) চেয়ে বেশী মিল আছে এমন কাউকেই দেখিনি । ফাতিমা (সাঃআঃ) যখন রাসূলের (সাঃ) নিকট আসতেন , মহানবী (সাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বসাতেন , তাঁর হাত টেনে চুমু দিতেন , স্বাগত জানাতেন । ফাতিমা (সাঃআঃ) পিতার সাথে একই রকম করতেন ।’
সূত্র – আবু দাউদ , বাবু মা জায়াফিল কিয়াম (৫২১৭) / সহীহ তিরমিযী , মানাকিবু ফাতিমা (৩৮৭১) ।

নবীকন্যা ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) হলেন রাসুল (সাঃ) এবং সকল মুমিনদের জননী ।
— কারন নবীজী (সাঃ) বলেন যে , ”ফাতেমা উম্মে আবীহা” অর্থাৎ ফাতেমা তাঁর পিতার মা ।
ফাতেমা (সাঃআঃ) যদি তাঁর পিতা রাসুলের (সাঃ) জননী হন তাহলে নবী পত্নীদেরও মাতা হবেন । কারন স্বামীর মাতাও মা হয় ।
আর দ্বিতীয় কথা হল — উম্মুল মুমেনিন (মুমিনদের মাতা) দের সর্দার ও মূলকেন্দ্র হলেন নবী করিম (সাঃ) ।
আর সেই সর্দারের জননী হলেন হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) ।

এবারে মূল প্রসঙ্গ —
হযরত মুহাম্মাদকে (সাঃ) সৃষ্টি না করলে কোনকিছুই সৃষ্টি হইত না । মাটি , আকাশ , গ্রহ , নক্ষত্র , চন্দ্র সূর্য এবং পানি কোনকিছুই সৃষ্টি হইত না । মহান আল্লাহ শুধুমাত্র রাসূলের (সাঃ) প্রেমের মায়ায় সবকিছু সৃষ্টি করলেন । যাঁর সুপারিশ ছাড়া সৃষ্টি জগতের কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না । যাঁকে আল্লাহ হাবীব অর্থাৎ বন্ধু বলে ডাকেন ।
যাঁকে আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টিজগতের রহমতের কান্ডারী এবং একমাত্র অনুকরনীয় আদর্শ বলে ঘোষনা করেছেন ।

” — আমরা কেবল আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরুপ প্রেরন করেছি —- ” ।
সুরা – আম্বিয়া / ১০৭ ।

” — নিঃসন্দেহে তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে (অনুসরনীয়) উত্তম আদর্শ রয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি আকাংখা পোষন করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরন করে — ” ।
সুরা – আহযাব / ২১ ।

যাঁর প্রতি মহান আল্লাহ স্বয়ং নিজে দরুদ-সালাম প্রেরন করেন ।
“ — নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাগন নবীর উপর দরুদ পড়েন । হে তোমরা যাদের বিশ্বাস আছে , তাঁর উপর দরুদ পড় এবং তাঁর উপর শান্তি কামনা কর যথাযোগ্যভাবে — “ ।
সুরা – আহযাব / ৫৬ ।

কতিপয় অর্ধশিক্ষিত উম্মাদ কাঠমোল্লার বয়ান মোতাবেক মাটির কতোবড় সাহস যে , রাসুলের (সাঃ) সৃষ্টি না হলে মাটির সৃষ্টি হইত না । অথচ ভাগ্যের মিথ্যার নির্মম পরিহাস এটাই যে , দয়াল নবীকে (সাঃ) মাটি চেনে না । যাঁর প্রেমে আল্লাহ সারাক্ষন দরুদ-সালাম প্রেরন করেন । অথচ মাটি তাঁকে চেনে না !
মাটি জান্নাতের সর্দার ইমাম হাসান (আঃ) ও ইমাম হোসেনকে (আঃ) চেনে না !
মাটি আবু তুরাব ইমাম আলীকে (আঃ) চেনে না । অথচ সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ইমাম আলীর (আঃ) জন্য পাগল ।

মাটি জান্নাতী মহিলাদের জান্নাতের সর্দারনী জগৎ জননী মা ফাতেমা যাহরাকে (সাঃআঃ) চেনে না !

যাঁর সন্তষ্টিতে আল্লাহ সন্তষ্ট হন এবং অসন্তষ্টিতে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন ।
বিশ্বনবী (সাঃ) বলেন , যার প্রতি আমার কন্যা ফাতেমা (সাঃআঃ) সন্তুষ্টি পোষন করবে আমিও তার প্রতি সন্তুষ্ট হব । আর যার উপর আমি সন্তুষ্ট হব আল্লাহও তার উপর সন্তুষ্ট হবেন । আর যার প্রতি ফাতেমা (সাঃআঃ) অসন্তুষ্ট পোষন করবে , আমিও তার প্রতি অসন্তুষ্ট পোষন করব । আর যার উপর আমি অসন্তুষ্ট হব মহান আল্লাহও তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন । হে সালমান ! ধ্বংস ও দুর্ভাগা সেই ব্যক্তি যে তাঁর এবং তাঁর স্বামী মুমিনদের আমিরের উপর অত্যাচার করবে । ধ্বংস ও দুর্ভাগ্য তার জন্য যে তাঁর শীয়া বা অনুসারী ও তাঁর পবিত্র বংশের উপর অত্যাচার করবে ।
সূত্র – ফারায়েদুস সিমতাইন , লেখক – সুন্নী আলেম হামওয়ানী, খন্ড ২, বাব ১১, হাদিস নং ২১৯ / কাশফুল গ্বাম্ম , খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৭ ।

প্রিয় পাঠক ,
নিজেই ভেবে দেখুন যে , হিসাব নেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ । তাহলে মাটি হিসাব নেওয়ার কে ? কে মাটিকে এমন ক্ষমতা দিল ? তাহলে মাটি কি দ্বিতীয় আল্লাহ হয়ে গেল নাকি ? (নাউজুবিল্লাহ)।
নচেৎ মাটি কিভাবে আল্লাহর চেয়েও ক্ষমতাবান হয়ে গেল ?
সে জান্নাতের সর্দারনী মা ফাতেমার (সাঃআঃ) আমল দেখার কে ?
আমল তো দেখবেন একমাত্র আল্লাহ ।
আপনার বিবেকই এর জবাব দিয়ে দেবে ।

সঙ্গত কারনে প্রশ্ন চলে আসে যে , রাসুলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) মান-মর্যাদাকে হীন করে দেওয়ার এই জাতীয় অপচেষ্টা কে বা কারা করছে ?

আলোচনার একটু গভীরে প্রবেশ করি ।
শুধুমাত্র রাসুলের (সাঃ) মুখের কথাকেই হাদিস বলা হয় ।
কোন সাহাবীর কথাকে হাদিস বলা হয় না । তাহলে কিভাবে হযরত আবু বকরের কথা হাদিস হয়ে গেল ?
কারন তখন তো রাসুল (সাঃ) এই দুনিয়াতে ছিলেন না । তাহলে এটা কিভাবে হাদিস হয়ে গেল ?
সূক্ষ্ণ কৌশলে রাসুলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) মান-মর্যাদাকে হীন করে দেওয়া হচ্ছে ।

রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পরে কতিপয় পথভ্রষ্ট ক্ষমতালোভী সাহাবাবৃন্দ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর খলীফা হয়ে গেলেন । ওদের এই খলাফতের প্রতি আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) বিন্দুমাত্র অনুমোদন ছিল না ।
মহান আল্লাহ যাদেরকে খলীফা এবং ইমাম হিসাবে নির্বাচিত করলেন তাদেরকে বঞ্চিত করে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যে , সাধারন মুসলিম জনতার কাছে রাসুলের (সাঃ) পুতঃপবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) মান-মর্যাদাকে হীন করে দেওয়া ।

জঘন্য নিকৃষ্ট এই অপচেষ্টার ষোলকলা পূর্ন হয়েছিল মুনাফিক মূয়াবীয়ার শাসন আমলে । রাষ্টীয় ক্ষমতায় থেকে পাক-পাজ্ঞাতনের অপমানে এইরকম হাজার হাজার জাল হাদিস তৈরি করে রেখে গেছে মুসলিম সমাজে । অসংখ্য মাদ্রাসা তৈরী করে সরকারি অর্থায়নে দরবারী আলেমগনকে দিয়ে এইসব জাল ভূয়া হাদিস পড়ানো হয় । বেঈমান মুনাফিক মূয়াবীয়ার নুন খাওয়া অসংখ্য মুফতি , মোহাদ্দেস , মাওলানা ও হাফেজগন অতি সুকৌশলে পাক-পাজ্ঞাতনের প্রতি বিষবৃক্ষ রোপন করে গেছে । মুসলিম জাতি কখনই যেন পাক-পাজ্ঞাতনের অনুসারী এবং তাঁদেরকে ভালোবাসতে না পারে – তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে গেছে হাজার হাজার জাল ভূয়া হাদিস তৈরী করে ।

অর্ধশিক্ষিত উম্মাদ কাঠমোল্লারা এইসব জাল হাদিস বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে কেঁদে কেঁদে এমনভাবে উপস্থাপন করে , যাতে সাধারন মুসলিম জনতা আবেগ আপ্লূত ও ভীত হয়ে যায় ।
অন্ধ মুসলিম জাতি একবাক্যে এসব গাজাখুরি হাদিস বিশ্বাস করে নেয় । একবারও হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে না । তাই সত্য আজ মুসলিম জাতিকে ত্যাগ করেছে । টাটকা মিথ্যার বিশাল প্রাসাদ গড়ে উঠেছে মুসলিম সমাজে ।

হে মুসলিম জাতি !
দয়া করে এবারে বিবেকের দ্বার উন্মোচন করুন । নচেৎ অমাবস্যার ঘন কালো অন্ধকার আপনাদের পিছু ছাড়বে না ।

মহান আল্লাহ স্বয়ং নিজে যাঁদেরকে পুতঃপবিত্র বলে ঘোষনা দিলেন তাঁদের সম্বন্ধে এইসব জাল হাদিস বিশ্বাস করতে লজ্জিত হন না কেন ?

“ – নিশ্চয়ই আল্লাহ চান তোমাদের কাছ থেকে সমস্ত অপবিত্রতা দূরে রাখতে , হে আহলে বাইত , এবং তোমাদেরকে পবিত্র করতে পূর্ন পবিত্রকরনের মাধ্যমে – “ ।
সুরা – আহযাব / ৩৩ ।

উল্লেখ্য যে , সুরা আহযাবের ৩৩নং আয়াতে পুতঃপবিত্র আহলে বাইতেগনের মধ্য একমাত্র মহিলা হলেন – খাতুনে জান্নাত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) ।

আশাকরি বহুল প্রচারিত টাটকা ডাঁহা মিথ্যা জাল হাদিসটি সম্বন্ধে সচেতন হলেন ।
আসুন প্রতিজ্ঞা করি – আজ থেকে এইসব গাজাখুরি জাল হাদিসগুলোকে ডাষ্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেই ।

সকলকে সালাম জানিয়ে আজকের মত বিদায় ।
খোদা-হাফেজ ।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − 11 =