————— গাদীর এ খুম —–
সালামুন আলাইকুম ।
সুপ্রিয় পাঠক ,
খুব সম্ভবত আগামী ১০ই আগষ্ট , রবিবার , ২০২০ দিবসটি হচ্ছে ১৮ই জিলহজ্ব , ১৪৪১ হিজরী ।
এই দিবসটি “ঈদে গাদীর” হিসাবে অত্যন্ত জাকজমকপূর্ন এবং আনন্দঘন পরিবেশে উৎযাপন করা হয় । প্রধানতম কারন হচ্ছে ১৮ই জিলহজ্ব তারিখে মহান আল্লাহর সরাসরি হুকুমে মহানবী (সাঃ) স্বয়ং নিজে বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে গাদীর নামক স্থানে সোয়ালক্ষ হজ্ব ফেরৎ হাজী সাহাবাগনের সম্মুখে হযরত আলীকে (আঃ) সর্বপ্রথম খলীফা এবং ইমাম হিসাবে নিযুক্ত করেন । অর্থাৎ রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পরে হযরত আলী (আঃ) হলেন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম খলীফা এবং ইমাম ।
দুঃখজনক বাস্তবতা হল যে , অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ঐতিহাসিক ঘটনাটি সম্পর্কে অধিকাংশ মুসলিম জনতা মোটেই অবগত নন ।
আসুন জেনে নেই – গাদীর এ খুম সম্বন্ধে বিস্তারিত ঘটনাসমূহ ।
এই দিবসটিকে “ঈদে গাদীর” কেন বলা হয় ?
এই দিবসটিতে কি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ?
পবিত্র কোরআনে বর্নিত আয়াত নাজিলের বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ।
সঙ্গত কারনে লেখাটি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে দুঃখিত । অনুরোধ রইল যে , ধৈর্য সহকারে পড়ুন । কথা দিলাম – অজানা অনেক কিছুই জানবেন ।
গাদীর এ খুম —
গাদীর — এই কথাটির অর্থ —
আরবী অভিধানে গাদীর এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণিত হয়েছে ।
যেমন , কোন এলাকার নীচু স্থান যেখানে বৃষ্টি বা বন্যার পানি জমা হয় এবং সাধারণত উক্ত পানি গরমকাল পর্যন্ত থাকত ।
সূত্র – গাদীর কুজা আস্ত , পৃষ্ঠা – ৪৩ ।
সৌদী আরবে বন্যা আসার যে রাস্তা তা হচ্ছে পূর্বদিক হতে লোহিত সাগর পর্যন্ত। সে যুগে উক্ত পথে একাধিক নীচু স্থান ছিল যেখানে বন্যা অথবা বৃষ্টির কারণে পানি জমে থাকত । আর উক্ত স্থানগুলো একটি জলাশয়ের আকার লাভ করত এবং জনগন তা থেকে পানি ব্যাবহার করত ।
আর উক্ত জলাশয়ের মতো স্থানগুলোকে আরবেরা গাদীর বলত । আর সে যুগে উক্ত শুষ্ক প্রান্তরে তখন সেই পানি মুসাফির এবং সাধারন মানুষের অনেক উপকারে আসত ।
সূত্র – গাদীর কুজা আস্ত , পৃষ্ঠা – ১১ ।
খুম — এই কথাটির অর্থ –
পবিত্র , হিংসা বিদ্বেষ বিহীন অন্তর । হয়তো সেখানে যে পানি একত্রিত হতো তা ছিল পবিত্র এবং পানের উপযুক্ত । হাজীদের হজ্ব থেকে ফেরার পথে একত্রিত হওয়ার স্থান ।
হজ্ব সম্পাদনর পরে হাজীরা তাদের পবিত্র অন্তর নিয়ে ফিরে আসত এবং তাদের অন্তর থাকত খুবই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ ।
সূত্র – মাদরেসে সাবযে গাদীর, পৃষ্ঠা – ২৭ ।
গাদীর এ খুমের ভৌগলিক অবস্থান —
অভিধান বেত্তা , ভূগোলবিদ এবং ঐতিহাসিকদের মতে গাদীর এ খুম হচ্ছে মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত ।
মক্কা থেকে ২০০ কিঃমিঃ এবং মদীনা থেকে ৩০০ কিঃমিঃ দূরে জলাশয়ের ন্যায় একটি স্থান যাকে খুম বলা হত এবং বর্তমানে তা গাদীর এ খুম নামে পরিচিত ।
সূত্র – গাদীর কুজা আস্ত, পৃষ্ঠা – ৪৫ ।
উত্তর ও দক্ষিন দুই এলাকার মাঝামাঝি একটি স্থান যা পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিক বরাবর ছিল এবং তা লোহিত সাগরের সাথে বন্যার সময় মিশে যেত ।
উক্ত এলাকায় সামুর নামক এক ধরণের গাছ পরিলক্ষিত হত । গাদীর এ খুমের গুনাবলির মধ্যে অন্যতম ছিল যে , সেখানের পানি কখনও শুকিয়ে যেত না আর পানি থাকার কারণে তার আশেপাশে বিভিন্ন গাছ ছিল এবং তা ছিল মুসাফিরদের জন্য একটি আরামের জন্য উত্তম স্থান ।
সূত্র – গাদীর কুজা আস্ত, পৃষ্ঠা – ১১ ।
বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ার পথে অনেক গাদীর (জলাশয়) ছিল যা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল । আর উক্ত গাদীরটি খুম নামে পরিচিত ছিল ।
সূত্র – গাদীর কুজা আস্ত, পৃষ্ঠা – ৪৪ ।
ঐতিহাসিকদের মধ্যে গাদীরের স্থান নিয়ে কোন দ্বিমত নেই যে তা মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ।
গাদীর এ খুম জোহফা উপত্যকায় অবস্থিত না জোহফা গ্রামে । জোহফা উপত্যকা গাদীর এ খুম থেকে শুরু হয়েছে এবং লোহিত সাগরে যেয়ে মিশেছে ।
সূত্র – গাদীর কুজা আস্ত, পৃষ্ঠা – ৪২, ৪৬ ।
বর্তমানে গাদীর এ খুমের অবস্থান –
বর্তমানে গাদীরকে একটি পরিত্যক্ত এলাকাতে পরিনত করা হয়েছে । সেখানে শুধুমাত্র একটি পানির উৎস রয়েছে । উক্ত স্থানটি বর্তমানে মক্কা থেকে ২০০ কিঃমিঃ এবং জোহফার নিকট রাবেগ নামক শহর থেকে ২৬ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত ।
আহলে সুন্নাতের একজন ভুত্বত্তবিদ আতিক বিন গাইস বালাদি (বালাদি হচ্ছে গাদীরের নিকটতম একটি স্থান) সৌদী সরকারের পক্ষ থেকে তাকে রাসুল (সাঃ) এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পথ নির্ধারণ করার দ্বায়িত্ব দেয়া হয় ।
সে উক্ত কাজে গাদীর এ খুমের স্থানকেও সঠিকভাবে সনাক্ত করেন এবং উক্ত স্থানের ছোটখাট সকল বিষয়কে উল্লেখ করেন ।
এছাড়াও শীয়া আলেম আল্লামা ডক্টর শেইখ আব্দুল হাদি ফাযলি গাদীর এ খুমের স্থানকে সনাক্ত করেছেন ।
বর্তমানে গাদীর এ খুম বিভিন্ন নাম দ্বারা পরিচয় করানোর চেষ্টা করানো হচ্ছে ।
ইসলামের শত্রুরা যতই চেষ্টা করুক না কেন আজও গাদীর এ খুমে পানির ঝর্ণা রয়েছে যার আকার রাসুলের (সাঃ) যুগ থেকে খুব একটা পরিবর্তন সাধিত হয় নাই এবং আজও গাদীর এ খূম রাসুলের (সাঃ) স্মৃতি বিজড়িত চিহ্নাবলিকে নিজের বুকে আগলে রেখেছে ।
ঈদে গাদীর —
আরবী ১৮ ই জিলহজ্ব ইসলামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন ।
“ঈদে গাদীর” নামে এই দিনটি পরিচিত ।
দশম হিজরির এই দিনে রাসুলে খোদা (সাঃ) যে ঐতিহাসিক ঘোষনা দেন তারই আলোকে এ দিনটি উদযাপিত হয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ আনন্দঘন পরিবেশে উৎযাপিত করে ।
সমগ্র মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে বার ইমামীয়া শীয়াদের নিকট এই দিনটি খুবই খুশী বা ঈদের দিন হিসাবে পরিগনিত হয়ে আসছে । কারন এই দিনটিতে মহান আল্লাহর সরাসরি হুকুমে রাসুল (সাঃ) তাঁর ইন্তেকাল পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত সর্বপ্রথম খলীফা , ইমাম হিসাবে হযরত আলী ইবনে আবু তালেবকে (আঃ) নিয়োগ দেন ।
গাদীর এ খুমের বিস্তারিত ঘটনা সমূহ —
আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এটা জানতেন যে , প্রত্যাদেশ বাণী বা আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান পূর্ণতা লাভ করার পর তিনি বেশীদিন ইহজগতে থাকবেন না । তাই নবম হিজরির পর থেকেই মূলত তিনি এ ব্যাপারে সাহাবাগনকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছিলেন । ঐ সময় ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা- দ্বন্দ্ব ও সংশয় সৃষ্টির জন্যে কাফের মুশরেকদের পক্ষ থেকেও জোর তৎপরতা শুরু হয়েছিল ।
তারা প্রচার করত যে , ইসলামের নবীর কোন পুত্র সন্তান নেই , কাজেই তার মৃত্যু হলে ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বও আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে পড়বে ।
এমন এক অবস্থায় মুসলমানদের মনে কিছুটা অস্বস্তি বিরাজ করছিল । মুমিন সাহাবাবৃন্দ এটা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করতেন , ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত একটি জীবন বিধান । এটা চিরস্থায়ী এবং পূর্ণাঙ্গ । পবিত্র কোরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্যে সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হচ্ছেন সর্বশেষ নবী এবং রাসুল । কাজেই এই ধর্ম চিরকাল টিকে থাকবে । ইসলামের বিধান শাশ্বত , অমর ও অক্ষয় ।
যতদিন এ জগত থাকবে ইসলামের দেদীপ্যমান দীপ্তি আলো বিকিরণ করে যাবে । এ আলো নিভিয়ে দেয়ার ক্ষমতা কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব নয় ।
জাজ্বল্যমান এই বিশ্বাসকে ধারণ করার পরও মুসলমানদের মনে অস্থিরতা বিরাজ করছিল । আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) ইহলোক ত্যাগের সম্ভাবনায় একদিকে তাদের মনে ছিল বিরহজনিত অন্তর্দাহ ।
অন্যদিকে ইহুদী , খৃষ্টান ও পৌত্তলিকদের অব্যাহত চক্রান্তের কথা ভেবে তারা ইসলামের ভবিষ্যতের ব্যাপারেও নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন ।
সবার কাছে এই প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল , প্রিয় নবীজী (সাঃ) যখন এ জগতে থাকবেন না , তখন কোন ব্যক্তি পবিত্র কোরআনকে ব্যাখ্যা করবেন , মুসলমানরাই বা জীবন জিজ্ঞাসার জবাব জানার জন্যে কার দ্বারস্থ হবেন ?
ইতোমধ্যে হজ্বের সময় ঘনিয়ে এল ।
রাসুলে খোদা (সাঃ) মুসলমানদেরকে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ্ব পালন করলেন ।
এটাই ছিল আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) প্রথম ও সর্বশেষ হজ্ব ।
বিদায় হজ্ব নামে যা আজও পরিচিত । হজ্বের সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নবীজী (সাঃ) এবার সোয়া লক্ষ হজ্ব ফেরৎ মুসলমানদের কাফেলাকে সঙ্গে নিয়ে মাতৃভূমি মক্কাকে বিদায় জানালেন , চলছেন প্রিয় মদীনার পথে ।
আল্লাহর রাসুলকে (সাঃ) খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছিল । এটা বিশিষ্ট সকল সাহাবীই লক্ষ্য করলেন । সবার মনেই এক অজানা আশঙ্কা ।
এমন সময় কাফেলা গাদীরে খুম নামক এক স্থানে এসে পৌঁছায় ।
গাদীরে খুম নামক স্থানটি মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি একটি এলাকায় অবস্থিত । মরু আরবের মুসাফির বা বাণিজ্য কাফেলাগুলো সাধারণত এই ছোট্ট জলাশয়ের পাশে সাময়িক বিশ্রামের জন্যে অবস্থান করত ।
আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যখন এই স্থানে এসে পৌঁছলেন তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) সুরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াত নিয়ে হাজির হলেন ।
বলা হল –
“ – হে রাসুল , পৌঁছে দাও যা তোমার কাছে অবতীর্ন হয়েছে তোমার প্রভুর কাছ থেকে এবং যদি তুমি তা না কর , তুমি তাঁর রেসালতই পৌঁছে দাও নি এবং আল্লাহ তোমাকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করবেন । নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফের দলকে পথ দেখান না —- “ ।
সুরা – মাইদাহ / ৬৭ ।
রাসুলে খোদা (সাঃ) আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর দায়িত্বের এই বোঝা থেকে মুক্ত হতে উদ্যোগী হলেন । তিনি সবাইকে সমবেত হতে বললেন । যারা কিছুটা এগিয়ে ছিলেন তারা পেছনে ফিরে তাকালেন । আর যারা পেছনে ছিলেন তারা খানিকটা এগিয়ে এলেন । রৌদ্রস্নাত উত্তপ্ত মরু হাওয়ায় সবাই ক্লান্ত অবসন্ন ।
তারপরও সকলেই প্রবল মনোযোগ সহকারে অপেক্ষা করতে লাগলেন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কিছু একটা বলবেন । মুসলমানদের জন্যে নতুন কোন বিধান বা দিক নির্দেশনা দেবেন ।
আল্লাহর রাসুল (সাঃ) উটের জিনকে মঞ্চের মত করে তাতে আরোহণ করলেন ।
এরপর সমবেত সকলকে লক্ষ করে বললেন , ”হে মুসলমানগণ ! অচিরেই আমার জীবনের অবসান ঘটবে , মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এ জগত ছেরে চলে যেতে হবে আমাকে । আমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল । আমি কি আমার উপর অর্পিত রেসালতের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছি ?
সকলেই সমস্বরে বলে উঠল , হে নবী (সাঃ) আপনি আপনার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং এ পথে আপনি অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন ।
এরপর আল্লাহর রাসুল ( সাঃ) চারদিকে তাকিয়ে হযরত আলীকে (আঃ) খুঁজে বের করলেন এবং হযরত আলীর (আঃ) দুই হাত উত্তোলন করে বললেন , মহান আল্লাহ হচ্ছেন আমার অলী এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী । আমি হচ্ছি মুমিন বিশ্বাসীদের অলী ও অভিভাবক ।
আর আমি যার নেতা, অভিভাবক ও মাওলা এই আলীও তার নেতা , অভিভাবক ও মাওলা ।
হে আল্লাহ ! যে আলীকে বন্ধু মনে করে তুমি তাকে দয়া ও অনুগ্রহ কর , আর যে আলীর সাথে শত্রুতা করে , তুমি তার প্রতি একই মনোভাব পোষণ কর ।
রাসু্লে খোদার (সাঃ) এই ভাষণের পরপরই হযরত জিব্রাইল ( আঃ) আবার অহী বা প্রত্যাদেশ বাণী নিয়ে এলেন ।
বলা হল —
“ – — আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম , তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন বা জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম —– ।
সুরা – মাইদাহ / ৩ ।
মহানবীর (সাঃ) এই ঘোষনা দেবার পর হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর , ইমাম আলীকে (আঃ) এ বলে অভিনন্দন জানালেন যে , “ইয়া আলী ইবনে আবু তালেব ! আজ থেকে আপনি সকল মুমিন ও মুমিনার মাওলা বা অভিভাবক হয়ে গেলেন ।”
সূত্র – মুসনাদে হাম্বাল , খন্ড-৪, পৃ-২৪ / তাফসিরে আল কাবীর, খন্ড-১২, পৃ-৪৯ / কানজুল উম্মাল, খন্ড-৬, পৃ-৩৯৭ / আর রিয়াযুন নাজরা, খন্ড-২ ,পৃ-১৬৯ / মুস্তাদারাকে হাকেম, খন্ড-৩, পৃ-১০৯ ইত্যাদি ।
গাদীরে খুমের ঐতিহাসিক ঘোষনায় আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কার্যত হযরত আলীকে (আঃ) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবেই নিযুক্ত করেছিলেন ।
তাই আমরা লক্ষ্য করি তাবুক অভিযানের সময় নবী করিমের (সাঃ) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে । কিন্তু নবীজী (সাঃ) হযরত আলীকে (আঃ) মদীনায় থেকে যেতে বললেন ।
হযরত আলী (আঃ) এর কারণ জানতে চাইলে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) উত্তরে বলেছিলেন , ”তুমি কি চাও না মুসার স্থলে হারুন যেমন ছিল , তেমনি আমার স্থলেও হোক তোমার স্থান । যদিও আমার পরে আর কোন নবী বা রাসুল আসবে না”।
রাসুলে খোদার ( সাঃ) অসংখ্য উক্তি বা বক্তব্যের আলোকে মুসলমানদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করেন , মহানবীর (সাঃ) পর মুসলমানদের নেতৃত্ব বা পবিত্র কোরআনের যথার্থ ব্যাখ্যার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছিল হযরত আলীর (আঃ) উপর ।
রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পরেই তিনি মুসলমানদের খলীফা এবং ইমাম হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন । আর এই দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে অর্পিত হয়েছিল মহান আল্লাহর সরাসরি হুকুমে গাদীরে খুমের ঐতিহাসিক স্থানে ।
নবুয়ত পদ্বতির সমাপ্তির পর ইমামত পদ্বতির সর্বপ্রথম ইমাম হচ্ছেন হযরত আলী (আঃ) । দিবসের দীপ্ত রবি অস্তমিত হওয়ার পর ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে প্রশান্তির বাণী নিয়ে যেমনিভাবে গগণ কোণে সন্ধ্যা তারার উদয় হয় ।
বিশ্বনবীর (সাঃ) অন্তর্ধানের পর আলোকবর্তিকা হিসেবে দিগভ্রান্ত ইসলামের গগণ কোণে দেখা দিলেন হযরত আলী (আঃ) ।
ইমাম আলী (আঃ) সম্পর্কে নবী করিম (সাঃ) বলেছেন , আলীর প্রতি প্রেম মানুষের পাপ এমনভাবে ধ্বংস করে যেমনি আগুন জ্বালানী কাঠ ধ্বংস করে দেয় ।
একবার হযরত আলীকে (আঃ) দেখে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছিলেন , তিনটি এমন বৈশিষ্ট্য তোমার রয়েছে যেটা আমারও নেই ।
এই তিনটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে , তুমি এমন একজনকে শ্বশুর হিসেবে পেয়েছ , যা আমি পাইনি , এমন একজনকে তুমি স্ত্রী হিসেবে পেয়েছে , যে কিনা আমার কন্যা , আর তৃতীয়টি হচ্ছে তুমি হাসান- হোসাইনের মত সন্তানের পিতা যেটা আমার নেই ।
গাদীর সম্পর্কিত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের তথ্যসূ্ত্র – তাফসীরে দুররে মানসুর , খন্ড – ৩, পৃ- ১১৭ / তাফসীরে কাবির , খন্ড – ১২ , পৃ- ৫০ / তাফসীরে মানারিজ , খন্ড – ২, পৃ-৮৬ / তাফসীরে আলুসি , খন্ড – ২, পৃ- ৩৮৪ / আসবাবুন নুযুল, পৃ- ১৩৫ / শাওয়াহেদুত তানযিল, খন্ড – ১, পৃ- ১৯২ / তারিখে দামেস্ক , খন্ড – ২ , পৃ- ৮৬ / ফাতহুল কাদীর, খন্ড – ২ , পৃ- ৬০ / মাতালেবাস সাউল, খন্ড- ১ , পৃ- ৪৪ / আরজাহুল মাতালেব, পৃ- ১১৯ (উর্দ্দু) / আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া , খন্ড – ৩, পৃ- ২১৩ / মুসনাদে হাম্বল , খন্ড – ৪ , পৃ- ২৪ / তারিখ আল খাতিব, খন্ড – ৮ , পৃ- ২৯০ / কানজুল উম্মাাল, খন্ড – ৬, পৃ- ৩৯৭ / আর রিয়াযুন নাজরা , খন্ড – ২, পৃ- ১৬৯ / মিসকাত আল মাসাবিহ, পৃ- ৫৫৭ / মুসতাদরাক হাকেম, খন্ড – ৩, পৃ- ১০৯ / সিবরুল আলামীন, পৃ- ৯ (ইমাম গাজ্জালী ) / আরজাহুল মাতালেব , পৃ- ৯০৭ – ৯৬৪ / ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাত , পৃ- ১২০ / দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা (বাংলাদেশ) , ৪ঠা মার্চ ২০০২ , ২৩শে জানুয়ারী ২০০৬ , ২৮শে জানুয়ারী ২০০৫ / আশারা মোবাশশারা , পৃ- ১৬৩ (এমদাদীয়া লাইব্রেরী) / মাসিক মদীনা , পৃ- ১৫ , জুন ২০০৫(বাংলাদেশ) / ঐতিহাসিক আল গাদীর , পৃ- ৫ – ১২৮, মীর রেজা হোসাইন শহীদ / ইসলামী বিশ্বকোষ , খন্ড – ১০ , পৃ- ৩০৭ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) / সহীহ আল বুখারী , খন্ড – ৫ , পৃ- ২৮০ (হামিদীয়া লাইব্রেরী) / সীরাতুন নবী , খন্ড- ২ , পৃ- ৬০৫ (তাজ কোং) / তাফসীরে মাযহারী , খন্ড – ৩ , পৃ- ৭৩৩ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) / সুনানে ইবনে মাজা , খন্ড – ১ , পৃ- ৪৩ , হাদিস নং – ১১৬ / তারিখে ইবনে কাসির , খন্ড – ৪ , পৃ- ২৮১ / মারেফাতে ইমামত ও বেলায়েত , পৃ-৬৪ থেকে ৬৯ ।
ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি কমপক্ষে ১১০ জন সাহাবা, ৮৪ জন তাবেঈন , ৩৫৫ জন ওলামা , ২৫ জন ঐতিহাসিক, ২৭ জন হাদিস সংগ্রহকারী , ১১ জন ফিকহাবিদ, ১৮ জন ধর্মতাত্বিক , ৫ জন ভাষাতাত্বিক বর্ননা করেছেন ।
বিঃদ্রঃ – ঐতিহাসিক গাদীর এ খুমের বিস্তারিত ঘটনা সমূহ রেফারেন্স সহ পড়ুন –
ঐতিহাসিক আল- গাদীর,
সংকলন সম্পাদনায় – মীর রেজা হুসাইন শহীদ,
ঢাকা , বাংলাদেশ ।
সকলকে “ঈদে গাদীর” উপলক্ষে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানিয়ে আজকের মত বিদায় ।

 

শেয়ার করুন