নামাজের শেষ বৈঠকে অর্থাৎ “তাশাহুদে” —-
“আশহাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” বলা যাবে কি না ?
সুপ্রিয় পাঠক ,
ইদানীং ফেসবুকে বিশেষ প্রকৃতির কয়েকজন ব্যক্তি যারা জীবনেও কোন ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যায়ন করেন নাই বা গভীরভাবে ধর্মচর্চা করেন নাই ।
নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে যে , আলু পটলের দোকানদার , রেষ্টুরেন্টের বাবুর্চি ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গ তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজেদেরকে প্রকৃত বার ইমামীয়া শীয়া এবং পবিত্র আহলে বাইতগনের (আঃ) একনিষ্ঠ প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করে স্যোশাল মিডিয়াতে বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবে ফেৎনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টির লক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন ।
তারা নানা কূট-কৌশলে প্রমাণ করতে চেষ্টা করছেন যে , বর্তমান বিশ্বের বার ইমামীয়া শীয়াদের ১০০% যারা মার্যায়ে তাকলিদের অনুসারী তারা মারাত্মক ভুল পথে আছেন । তাদের দৃষ্টিতে মার্যায়ে তাকলিদ হচ্ছে হারাম ।
এ সকল ফেৎনা সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টিতে বার ইমামীয়া শীয়াদের অন্যতম ভুল সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে – বার ইমামীয়া শীয়ারা তাদের প্রাত্যাহিক নামাজে মাওলা আলীর (আঃ) বেলায়েত বা ইমামতের পক্ষে সাক্ষ্য দেয় না !
অথচ তারা সর্বক্ষেত্রে এমন কি নামাজের তাশাহুদেও “শাহাদাতে ছালাছা”-তে অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য , হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) রেসালতের সাক্ষ্য এবং ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়েত বা ইমামতের সাক্ষ্য দান করে থকেন ।
তাদের দাবী হল যে , বার ইমামীয়া শীয়ারা পুতঃপবিত্র ইমামগনের (আঃ) সত্যিকারের শীয়া বা অনুসারী নন ।
তারা এই জাতীয় প্রচার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবের অনুসারীদের মধ্যে প্রচন্ড ভুল ধারনার সৃষ্টি এবং বার ইমামীয়া শীয়াদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে দলাদলি এবং অপযুক্তির আড়ালে ইসলামের মুলনীতি সমূহকে সংশয় ও প্রশ্নবিদ্ধ করার অচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন ।
অবশ্য এই জাতীয় লোকের সংখ্যা খুবই সামান্য । তবে প্রচার ও প্রোপাগান্ডায় ব্যাপক কারন তারা টিম ওয়ার্ক করছেন । একই ব্যক্তির অসংখ্য ফেসবুক একাউন্ট বিদ্যমান ।
তারা বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বা শীয়া-সুন্নি মাযহাবের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী । শুধু তাই নয় বরং বিশ্বে যেসব সংগ্রামী দল আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করছেন যেমন , হামাস , হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর মতো মুজাহিদদের বিরুদ্ধেও তারা অবস্থান গ্রহন করেছেন । তাদের এই জাতীয় চিন্তাগত অবস্থান ও প্রচারই প্রমান করে যে , তারা বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ বিরোধী পক্ষ থেকে রসদ সংগ্রহ করছেন এবং তাদের নীলনকশা ব্যাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন ।
কেননা দীর্ঘদিন ধরে ঐ শয়তানী শক্তিগুলো আহলে বাইতের (আঃ) অনুসারীদের মধ্যে উগ্রবাদী দল “আল কায়েদা ও আই এস”-এর মতো সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থী শীয়া টিম গঠনের আপ্রান চেষ্টা করছেন ।
তাই তথাকথিত “আখবারি শীয়া” নামে আত্মপ্রকাশকারী উগ্রপন্থী দলের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে —
১) – তারা বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী এবং অনৈক্য সৃষ্টির পক্ষে কাজ করছে ।
২) – বার ইমামীয়া শীয়া নাম ধারন করে নবীপত্মী বিশেষ করে উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশা এবং প্রথম তিন খলীফা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের স্পর্শকাতর ব্যক্তিবর্গকে অবিরাম গালিগালাজ করা ।
৩) – বার ইমামীয়া শীয়াদের সর্বজন স্বীকৃত বিখ্যাত এবং সম্মানীত মুজতাহিদ , মার্যা , মহান আলেমগনকে খুবই অশ্লীল ভাষায় তিরস্কার করা ।
৪) – তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কোন কার্যক্রম নেই । শুধুমাত্র অহেতুক বিতর্কমুলক আলোচনা এবং ফেৎনা-ফ্যাসাদ ব্যতীত।
৫) – আপাঃতত বাংলাদেশের পেক্ষাপটে তাদের পক্ষ থেকে কোন আলেম বা মুজতাহিদ নাই । তবে তা তৈরী বা আমদানীর জোর চেষ্টা চলছে ।
যাহোক , তারা নিজেরকে তথাকথিত শীয়া হিসাবে উপস্থাপন করলেও তারা নানা কূট-কৌশলে বিশ্বের বার ইমামীয়া শীয়া সম্মানীত আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলেন । শুধু তাই নয় বর্তমান বিশ্বে ইরানের ইসলামী বিপ্লব যা মুসলিম [শীয়া ও সুন্নী] উম্মাহর মনে নব্য ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় আশার সঞ্চয় করেছে তারা সেই ইসলামী বিপ্লব ও তার নেতাদের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে বিরোধীতা করেন ।
সুতরাং এ জাতীয় মানুষেরা মূলত মুসলিম বিশ্বে শীয়া-সুন্নী মাযহাবের মধ্যে বিদ্বেষ ও হানাহানির পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে পাশ্চাত্যের অপশক্তিদের আজ্ঞাবাহী দাস হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে । আর এজন্যেই তারা শীয়া নামে আত্মপ্রকাশ করে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সৃষ্টিকারী নীতির বিরোধী হিসাবে অবস্থান নিয়েছে ।
একই সাথে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও রাহবারের বিরুদ্ধে এবং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে গড়ে তোলা এই টিমকে তথ্যগত ও যুক্তিতর্কের ক্ষেত্রে টিম আকারে সহযোগিতা করছেন ঐ শয়তানী শক্তিগুলো । কোন কোন সময় তারা শীয়া মাজহাবের বর্জিত ও বির্তকিত বিষয়গুলো পঁচা ইতিহাস থেকে কুড়িয়ে এনে নতুন করে পরিবেশ দূর্গন্ধ করার নিমিত্তে সাজিয়ে দিচ্ছেন ।
যাহোক , এমনই একটি দলের প্রোপাগান্ডা মূলক একটি প্রশ্ন যা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচলিত শীয়াদের বিরুদ্ধে ।
প্রশ্নটি হচ্ছে হাদিসে বলা হয়েছে – “যখন তোমরা মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুলের রেসালাতের সাক্ষ্য দিবে তখন তোমরা আলীর বেলায়াতেরও সাক্ষ্য দিবে”।
অথচ বার ইমামীয়া শীয়া জনগোষ্টি তাদের নামাজে মহানবীর (সাঃ) রেসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার পর ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়াতের পক্ষে সাক্ষ্য দেয় না !
এদের উপস্থাপিত প্রশ্নটি সাধারন শীয়া মুসলিম জনতার কাছে বাহ্যিকভাবে একটি যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন মনে হলেও এখানে বেশ কয়েকটি লক্ষনীয় বিষয় রয়েছে যা সাধারন শীয়া মুসলিম জনতার জানা নাই ।
পাঠক ,
দয়া করে নীচের লেখাগুলি গভীর মনযোগ সহকারে লক্ষ্য করুন ।
জাফরী ফিকহা তথা বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবের মুল ভিত্তিই হচ্ছে — ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়েত বা ইমামতের স্বীকৃতি ।
(১) –
পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিসের ভিত্তিতে মহানবীর (সাঃ) ইন্তেকালের পর ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) হচ্ছেন সৃষ্টিজগতে ঐশী প্রতিনিধি , সর্বপ্রথম খলীফা বা ইমাম ।
এককথায় ইমাম আলী (আঃ) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন পুতঃপবিত্র ইমামগন (আঃ) হলেন মহানবীর (সাঃ) ইন্তেকাল পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত উত্তরসূরি বা বেলায়াত তথা ইমামতের যোগ্য অধিকারী । যা বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবের একটি মুলভিত্তি ও অনস্বীকার্য বিষয় ।
উল্লিখিত মাকাম বা ঐশী মর্যাদা শুধুমাত্র ইমাম আলীর (আঃ) জন্যে নির্ধারিত নয় বরং এই অধিকার প্রত্যেক পুতঃপবিত্র ইমামের (আঃ) ।
এ ক্ষেত্রে কারও কোন প্রকারের বিন্দুমাত্র দ্বিমত দ্বিধাদ্বন্দ্ব নাই ।
অতএব বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে প্রত্যেক পুতঃপবিত্র ইমামগনের (আঃ) আদেশ-নিষেধ মহানবীর (সাঃ) আদেশ-নিষেধের সমতুল্য । সুতরাং এ পর্যন্ত বিশ্বাস ও আক্বীদাগত দিক থেকে কোন সমস্যা নাই ।
ইবাদতের প্রকার ভেদ –
(২) –
ইসলামের সামগ্রিক ইবাদতসমূহ দুই প্রকার –
(ক)তৌক্বিফি ও
(খ) এখতিয়ারী ।
“তৌক্বিফি” কথার অর্থ হল আল্লাহ বা স্বীকৃত প্রতিনিধি দ্বারা নির্ধারিত ইবাদতে পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে । যেমন নামাজ হল একটি আবশ্যিক বা ফরজ ইবাদত যার পদ্ধতি সমূহ “তৌক্বিফি” । আর যেসব ঐচ্ছিক আমল যা বান্দা নিজে এখতিয়ার করেন ।
যেমন আমি নজর করলাম আমার হজত পূর্ণ হলে একশতবার এই এই [আমি নিজের ইচ্ছা মতো নিধার্রণ করছি] দোয়া বা আমল করিব । সমস্ত ফরজ ইবাদতের আদ্যপাদ্য তৌকিফী বা পূর্ব নির্ধারিত বিষয় যা মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইবাদতের সামগ্রিকরূপ নির্ধারিত । এ জাতীয় ইবাদতে কেউ কোন কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করার অধিকার রাখে না ।
আর এজন্যেই মহানবীকে (সাঃ) যখন প্রশ্ন করা হল , ‘কিভাবে নামাজ আদায় করিব ?
রাসুল (সাঃ) উত্তর দিলেন , ‘আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ ঠিক সেভাবেই তোমরা নামাজ পড় ।’
তাহলে নামাজের শেষ বৈঠক অর্থাৎ তাশাহুদে রাসুল (সাঃ) যদি ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়াতের সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন তাহলে আমরাও সাক্ষ্য দিতে বাধ্য থাকিব । এতে বিন্দুমাত্র সমস্যা নাই ।
অথচ ঐতিহাসিকভাবে এমন কোন ইতিহাস বা রেওয়ায়েত নাই যে , মহানবী (সাঃ) নামাজের মধ্যে ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়াতের সাক্ষ্য দিয়েছেন !
সুতরাং প্রশ্নই উঠে না – নামাজের মধ্যে যা মহানবী (সঃ) স্বয়ং নিজে করেননি তা তাঁর শীয়া বা অনুসারীগন পালন করবেন ।
অন্যদিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়াত ও ইমামতের কথা জিকির করেছেন আমরাও সেভাবে জিকির করি এবং তাঁর সমস্ত আদেশ-নিষেধ শিরোধার্যরূপে গ্রহণ করে থাকি ।
প্রিয় পাঠক ,
জেনে নেই – ঐতিহাসিক পেক্ষাপটে “শাহাদাতে ছালাছ্বা” ।
জাফরী ফিকহা তথা বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবের কোন রেওয়ায়েতে বা ইতিহাসে প্রমানিত হয় নাই যে , ‘আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ’ এই বাক্যটি আযান বা নামাজের তাশাহুদের অংশ হিসাবে ছিল ।
আর এজন্যেই অনেকেই আযানেও উল্লেখিত বাক্যটি উচ্চারণ করতে নিষেধ করেছেন । কেননা উল্লেখিত বাক্যটি ইতিহাসে কখনই আযান বা তাশাহুদের অংশ ছিল না । আর যা আযান বা তাশাহুদের অংশ নয় তা আযান ও তাশাহুদের অংশ হিসাবের পাঠ করা সম্পূর্ণ বিদআত বা হারাম ।
আর এই কারনেই সমস্ত মুজতাহিদগনের হুকুম হল যে , আযানের ক্ষেত্রে কেউ ”আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” পাঠ করাকে যদি আযানের অংশ হিসাবে পড়েন তাহলে তার আযান বাতিল হয়ে যাবে ।
আর যদি কেউ সওয়াবের লক্ষ্যে যেমন আযানে রাসুলুল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে সবাই দরুদ পাঠ করেন । যদিও দরুদ আযানের অংশ নয় শুধুমাত্র সওয়াবের আশায় মুয়াজ্জিন “আশ হাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এর পর পাঠ করেন । তাহলে কোন সমস্যা নাই ।
তদ্রুপ কেউ সওয়াবের আশায় যদি রাসুলের (সাঃ) রেসালতের সাক্ষ্য দেয়ার পর ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়াতের সাক্ষ্য দেন তাহলে কোন কোন মার্যার দৃষ্টিতে সমস্যা নাই ।
ইমাম বাকের (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , ‘মিরাজের রাতে বাইতুল মা’মুর হযরত জিব্রাইল (আঃ) আযান ও ইক্বামত পাঠ করেন আর মহানবী (সাঃ) সম্মুখে দাঁড়িয়ে নামাজের ইমামতি করেন ।
রাবী উক্ত আযান এবং ইকামত সম্পর্কে ইমামকে (আঃ) প্রশ্ন করেন এবং তিনি আযানের যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখানে “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” বাক্য নাই ।
সূত্র – শেইখ তুসী/মুহাম্মাদ/ বিন হাসান , তাহজিবুল আহকাম গ্রন্থ, খন্ড- ২, পৃঃ- ৬০; প্রকাশক দারুল কিতাব আল ইসলামী, তেহরান, চতুর্থ প্রকাশ, ১৪০৭ হিঃ ।
একইভাবে ইমাম হোসেন (আঃ) নিজ পিতা আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আঃ) থেকে মি’রাজের রাতে মহানবীর (সাঃ) নামাজের পূর্বে জনৈক ফেরেস্তার আযান ও ইকামতের বর্ণনা করেছেন সেখানেও “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” নাই ।
সূত্র – দাওয়ায়েম আল ইসলামী গ্রন্থ, ক্বাজী নোমান বিন মুহাম্মাদ, তামীমি, দারুল মাওয়ারেফ, ১খন্ড, ১৪২পৃ. কায়রো, মিশর ।
অতএব আযান , ইকামত বা তাশাহুদে “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” পাঠের কোন সুস্পষ্ট নির্দেশ মহানবী (সাঃ) থেকে রেওয়ায়েতে আসে নাই ।
কোন কোন ব্যক্তি ‘লিস সালাফা ফি আমরুল খিলাফা’ নামক গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে দুইটি কাহিনী বর্ণনা করেন যে , গাদীরে খুমের ঘটনার পর হযরত সালমান (রাঃ) এবং হযরত আবুজার (রাঃ) আযানে “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” পাঠ করেছেন । কিন্ত দুঃখের বিষয় হল যে , ঐ গ্রন্থটি আজ পযর্ন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নাই ।
এখানে আরও লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে – উক্ত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি মুলক ঐ বর্ণনা হিজরী সপ্তম শতকের পূর্বের কোন গ্রন্থে উল্লেখিত কাহিনী দুটি বর্ণনা হয় নাই ।
অথচ মহানবী (সাঃ) থেকে সরাসরি ইমামগণ (আঃ) যে আযান বর্ণনা করেছেন তাহল –
اللَّهُ أَکْبَرُ اللَّهُ أَکْبَرُ اللَّهُ أَکْبَرُ اللَّهُ أَکْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَسُولُ اللَّهِ حَیَّ عَلَى الصَّلَاةِ حَیَّ عَلَى الصَّلَاةِ حَیَّ عَلَى الْفَلَاحِ حَیَّ عَلَى الْفَلَاحِ حَیَّ عَلَى خَیْرِ الْعَمَلِ حَیَّ عَلَى خَیْرِ الْعَمَلِ اللَّهُ أَکْبَرُ اللَّهُ أَکْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ. [(১) শেইখ সাদুক (রহ:), মান লা ইয়াহ দারুল ফাকীহ, খন্ড- ১, পৃঃ- ২৮৯ ও ২৯০; প্রকাশকঃ জামেয়ে মুদাররেসিন, কোম, ইরান, ১৪১৩ হিজরী। (২) তাহজীবুল আহকাম গ্রন্থ, শেইখ তুসী, খন্ড- ২, পৃঃ- ৬]
শাহাদতে ছ্বালাছ্বা ও শীয়াদের বিশ্বাস –
ইমাম আলীর (আঃ) বেলায়াতের সাক্ষ্য প্রদানে সওয়াব ও ফজিলত সম্পর্কে কারও বিন্দুমাত্র দ্বিমত ও বিতর্ক নাই । এমনকি আমাদেরকে “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ।
ইমাম সাদেক (আঃ) বলেন , ‘আসমান ও জমীন সৃষ্টির পর তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে , প্রত্যেক আহ্বানকারী যেন ঐ তিন নামে সাক্ষ্য প্রদান করে’ । সূত্র – কুলাইনী, মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুব, উসুল আল ক্বাফী গ্রন্থ, খন্ড- ১, পৃঃ- ৪৪১; প্রকাশনীঃ দারুল ইসলামীয়া, তেহরান, ইরান । প্রকাশকাল- ১৪০৭, চতুর্থ প্রকাশ । / সেইখ সাদুক , আমালী গ্রন্থ, পৃষ্ঠা- ৬০৪, বৈরুত প্রিন্ট, পঞ্চম প্রকাশ ১৪০০ হিজরী ।
অতএব মাওলা আলীর (আঃ) বেলায়েতের সাক্ষ্য কেন দেব ।
কেননা জিকরে আলী ইবাদত সমতুল্য । আমরা আমাদের প্রতিটি জলসায় অনুষ্ঠানে উচ্চকন্ঠে বলে থাকি “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ”।
কিন্ত জিকিরের বাক্যগুলো মহান প্রতিপালক নিধার্রণ করে দিয়েছেন সেখানে নিজের মত মতো বাহাদূরি করা যাবে না ।
কেননা মহানবী (সঃ) যিনি মাওলা আলীর (আঃ) বেলায়েতের সাক্ষ্য দিতে বলছেন । তিনিই নামাজ ও আযানের বাক্যগুলো ভিন্নভাবে সাজিয়ে দিচ্ছেন । বার ইমামীয়া শীয়া মাজহাবে দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী আযান ও নামাজের বাক্যগুলো সম্পূর্ণরূপে মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাই সেখানে কোন বান্দা হস্তক্ষেপ করতে পারে না ।
একইভাবে আরও বর্ণিত হয়েছে – যখন মহান আল্লাহর রব্বুল আলামীন আরশ ও কুরসী সৃষ্টি করলেন তখন সেখানে লিপিবদ্ধ করা হল , … لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ، عَلِیٌّ أَمِیرُ الْمُؤْمِنِین সুতরাং যখনই তোমরা لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ، পাঠ করবে তখন عَلِیٌّ أَمِیرُ الْمُؤْمِنِین পাঠ করবে ।
সূত্র – তাবারসী, আহমাদ ইবনে আলী, আল ইসতেজাজ আলা আহলুল লুজাজ, খন্ড- ১, পৃষ্ঠা- ১৫৮; মোর্তজা প্রকাশনী, মাশহাদ, প্রথম প্রকাশ, ১৪০৩ হিজরী ।
সর্বশেষ মূল্যায়ন —
ইসলামী শরীয়তে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যেভাবে আদেশ দিয়েছেন ঠিক সেভাবেই পালন করতে হবে । এখানে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করা যাবে না । এই অধিকার আল্লাহ কোন মুমিন বান্দাকে দেন নাই ।
” —- এবং কোন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর এই অধিকার নেই যে , যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোন বিষয় ফয়সালা দান করেন তখন তারা সে ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্বান্ত গ্রহন করে এবং যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের হুকুম অমান্য করবে নিঃসন্দেহে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত হয়েছে —- ” ।
সুরা – আহযাব / ৩৬ ।
তাই মহানবী (সাঃ) কতৃক প্রদত্ত শরীয়ত তিনি যেভাবে পালন করে গেছেন আমাদেরও ঠিক সেভাবেই পালন করতে হবে ।
অবশ্যই সকল বান্দার মাওলা আলীর (আঃ) প্রতি সম্মান , শ্রদ্বা এবং গভীর ভালবাসা আছে । সবাই ইমাম আলীকে (আঃ) ভক্তি-শ্রদ্বা করে ।
সাধ্যমত “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” বলুন । অবশ্যই এজন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব পাবেন ।
কিন্ত দয়া করে নামাজের শেষ বৈঠক তথা “তাশাহুদে” এই বাক্যটি সংযুক্ত করবেন না । কেননা মহানবী (সাঃ) নিজে এই বাক্যটি “তাশাহুদে” সংযোজন করেন নাই ।
ফেরেশতাগন ও মহান আল্লাহ আযান , ইকামত এবং তাশাহুদের মধ্যে মাওলা আলীর (আঃ) বেলায়াতের সাক্ষ্য প্রদানকারী বাক্যটি আনেন নাই ।
শুধুমাত্র এই কারনেই আমাদের সম্মানীত আলেমগন তাশাহুদে “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” পাঠ করেন না ।
দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর আযানের সাথে যখন “الصلاه خیر من النوم” বাক্যটি সংযোজন করেন তখন ইমাম আলী (আঃ) নিষেধ করেন যে , যা আযানের অংশ নয় তা আযানে সংযুক্ত করা উচিত নয় ।
সূত্র – আহলে সুন্নাতের প্রশিদ্ধ আলেম শওকানী , নেইলুল আতওয়ার গ্রন্থ, খন্ড- ২, পৃষ্ঠা- ৪৩ ।
শুধু তাই নয় । বরং ইতিহাসে কোন এক সময় একশ্রেণীর শীয়া নামধারী ব্যক্তি উক্ত বাক্যটিই আযানের সাথে সংযোজন করেন । তখন শেইখ সাদুক (রহঃ) তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষন করেন ।
সূত্র – শেইখ সাদুক (রহঃ), মান লা ইয়াদারুল ফাকিহ, ১খন্ড, ১৮৮ পৃষ্ঠা ।
বিঃদ্রঃ – এখানে লক্ষনীয় যে , আযান এবং ইকামত – এই দুটি হচ্ছে মুস্তাহাব আমল । কিন্ত “তাশাহুদ” অবশ্যই নামাজের আভ্যন্তরীন আমল । সেই দৃষ্টিকোন থেকে পরিস্কারভাবে বলা যায় যে , রাসুল (সাঃ) নিজে এই বাক্যটি “তাশাহুদে” সংযোজন করেন নাই । অতএব পৃথিবীর কোন মুমিন ব্যক্তির পক্ষে নামাজের তাশাহুদে “আশ-হাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” বাক্যটি সংযোজন করার সামান্যতম সুযোগ নাই ।
নামাজের শেষ বৈঠকে অর্থাৎ “তাশাহুদে” —-
“আশহাদু আন্না আলীয়্যান ওয়ালী উল্লাহ” বাক্যটি সম্পর্কে শীয়া সমাজে প্রচলিত নতুন একটি ফেৎনা থেকে মুক্ত হলেন ।
সকলকে ধন্যবাদ ও সালাম জানিয়ে আজকের মত বিদায় ।
খোদা-হাফেজ ।
শেয়ার করুন