নবী-রাসুলগন , পবিত্র ইমামগন এবং আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াগনের পবিত্র কবরের নিকট নামাজ ও দোয়া পাঠ মুস্তাহাব হওয়ার পক্ষে দলীল ।

১) –
মহানবী (সাঃ) অথবা অন্য যে কোন আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াগনের পবিত্র কবরের সংশ্লিষ্ট ভূমি অন্য স্থানসমূহের মতই ভূমি হিসেবে বিবেচিত । তাই যে কোন ভূমি ও স্থানে যেরূপ নামাজ পড়া জায়েয ঐ স্থানগুলো তার হতে ব্যতিক্রম নয় ।

২) –
মহান আল্লাহ বলছেন ।

“ — যখন তারা নিজেদের উপর জুলুম করেছিল তখন যদি তোমার (রাসুলের) নিকট আসত এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তবে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তওবা কবুলকারী ও অতিশয় দয়ালু হিসেবে পেত —।”
সূরা – নিসা / ৬৪ ।

উপরিউক্ত আয়াতটিতে ((جاءوک)) শব্দ এসেছে যা সকল কালকেই শামিল করে । অর্থাৎ রাসূলের (সাঃ) জীবিত ও ইন্তেকালীন উভয় অবস্থায়ই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত ।
রাসূলের (সাঃ) জীবদ্দশায় যেমন মানুষ গুনাহ করত , তাঁর ইন্তেকালের পরও তারা গুনাহ করবে ,এটাই স্বাভাবিক । তাই তারা ক্ষমার জন্য সবসময়ই এরূপ মাধ্যমের মুখাপেক্ষী । তারা যাঁর শরণাপন্ন হবে তাঁর ক্ষমা প্রার্থনার কারনে আল্লাহ ঐসকল গুনাহকারী বান্দাকে ক্ষমা করবেন । তাই নামাজ ও দোয়া যা ক্ষমা প্রার্থনার উপকরন তা রাসূলের (সাঃ) পবিত্র কবরের নিকট সম্পাদিত হওয়াতে কোন অসুবিধা নাই।
কারন এরূপ ইবাদত তাঁর কবরের নিকট হলে তাঁর অসিলায় তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে ।

৩) –
নিঃসন্দেহে কোন কবরস্থানে কবরবাসীর ইবাদতের উদ্দেশ্যে এবং কবরকে কিবলা বানিয়ে নামাজ পড়া হারাম ও শিরক বলে পরিগনিত । কিন্ত কোন মুসলমানই এরূপ কাজ করে না । এমন নিয়তেও কেউ কবরের নিকট নামাজ পড়তে যায় না ।
বরং মুসলমানরা আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের পবিত্র দেহ মোবারক হতে বরকত লাভের উদ্দেশ্যেই তাঁদের কবরের নিকট নামাজ পড়ে ও দোয়া করে । কারণ তারা বিশ্বাস করে এরূপ পবিত্র স্থানে নামাজ ও দোয়ায় অধিক সওয়াব রয়েছে ।
যদি ঐ স্থানের মর্যাদা ও বরকত না-ই থাকবে , তবে কেন প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা রাসূলের (সাঃ) পবিত্র কবরের পাশে নিজেদের সমাধিস্থ করার জন্য জোর সুপারিশ করেছিলেন ?
ঐ স্থান বরকতময় হওয়ার কারনেই নয় কি ?
তেমনিভাবে মুসলমানরাও আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের পাশে একই নিয়তে নামাজ পড়ে থাকে ।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আসাহবে কাহফের স্বজাতী একত্ববাদী মুমিনরা কেন তাঁদের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ? নিশ্চয়ই তাঁদের ফরজ নামাজ ও ইবাদতসমূহ তাঁদের কবরের নিকটে সম্পাদনের উদ্দেশ্যে যাতে করে সেখান হতে বরকত লাভ করতে পারেন ।
এ কারণেই জামাখশারী সূরা কাহফের ২১ নং আয়াতের তাফসীরে বলেছেন ,‘ তাদের প্রস্তাব এ লক্ষ্যেই ছিল যে ,যাতে করে মুসলমানরা সেখানে নামাজ পড়তে পারে ও তাঁদের কবর হতে বরকত লাভ করতে পারে ।’
সূত্র – জামাখশারী ,আল কাশশাফ ।

মহান আল্লাহ আসহাবে কাহফের স্ব জাতির মুমিন ব্যক্তিদের প্রস্তাবকে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন । অথচ তার কোন প্রতিবাদ না করে নীরবতা পালন করেছেন ।
অতএব পুরো বিষয়টি জায়েয ও বৈধ হওয়ার স্বপক্ষে এটি একটি শক্তিশালী দলীল ।

৪) –
মহান আল্লাহ হাজীদের নির্দেশ দিয়েছেন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) দাঁড়ানোর স্থানে (মাকামে ইবরাহীমে) নামাজ পড়ার জন্য ।
মাকামে ইবরাহীম হল ঐ স্থান যে পাথরটির উপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবাগৃহ নির্মাণের সময় দাঁড়িয়েছিলেন ।

মহান আল্লাহ বলেন :

“ —- (স্মরণ কর) যখন আমরা কাবগৃহকে মানবজাতির জন্য তীর্থতস্থান ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল করেছিলাম এবং (আদেশ দিয়েছিলাম) ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাজের স্থান বানাও —-। ”
সূরা – বাকারা / ১২৫ ।

আমরা অবগত যে ,ঐ স্থানটির নিকট নামাজ পড়ার নির্দেশ এজন্য যে ,যাতে করে তা হতে নামাজ আদায়কারী বা হাজীগন বরকত লাভ করতে পারেন ।

৫) –
আল্লামা সুয়ূতী মিরাজ সম্পর্কিত হাদিসের আলোচনায় বলেছেন ,‘মহানবী (সাঃ) মদীনা , সিনাই প্রান্তরের তুর পর্বত ,বাইতে লাহাম (বেথেলহাম) সহ যে স্থানেই মিরাজের রাত্রে গিয়েছেন সেখানেই নামাজ পড়েছেন । প্রতিটি নামাজের স্থানে জীবরাইল (আঃ) মহানবীকে (আঃ) স্থানটি পরিচয় করিয়ে দেন ।
যেমন মদীনায় বলেন ,‘ হে রাসূল (সাঃ) ! আপনি কি জানেন , কোথায় নামাজ পড়ছেন ? আপনি এক পবিত্র শহরে নামাজ পড়ছেন যেখানে আপনি হিজরত করবেন ।’
সিনাইয়ের তুর পর্বতের নিকট বলেন ,‘ এটি সেই স্থান যেখান আল্লাহ হযরত মূসার (আঃ) সঙ্গে কথা বলেছিলেন ।’
বেথেলহামে বলেন ,‘ এটি হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থান ।
সূত্র – আল খাসায়িসুল কুবরা , ১ম খণ্ড,পৃ. ১৫৪ ।

সুতরাং আমাদের নিকট স্পষ্ট যে ,বেথেলহাম হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থান হিসেবে বরকতময় হয়েছে এবং এ কারণেই মহানবী (সাঃ) সেখানে নামাজ পড়েছেন ।
হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানে তাঁর কোন শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও কেবল স্মৃতিচি‎হ্ন হওয়ার কারণে তা সম্মানীত ।
এর বিপরীতে যেখানে আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবর রয়েছে , তা তার দেহের উপস্থিতির কারনে অবশ্যই বরকতময় ।

৬) –
মুসলমানরা হজ্বের সময় “হিজরে ইসমাঈলের” নিকট নামাজ পড়ে থাকে । অথচ ঐ স্থানটিতে হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও তাঁর মাতার (হাজরা) কবর অবস্থিত ।
হযরত ইসমাঈলের (আঃ) কবরের সঙ্গে মহানবীর (সাঃ) কবরের কি পার্থক্য রয়েছে ?

৭) –
যদি রাসূলের (সাঃ) কবরের পাশে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ হয় ,তবে কেন উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাসুলের (সাঃ) কবরের নিকট অবস্থান করেছেন ও সেখানে নামাজ পড়েছেন ?

নারীকূল শিরোমণি খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (সাঃআঃ) যাঁর ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) বলেছেন , ‘ফাতিমার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি’ ।
তিনি কেন রাসূলের (সাঃ) জীবদ্দশায় প্রতি জুমআর দিন (শুক্রবার) হযরত হামজার (রাঃ) কবরের নিকট যেতেন ও সেখানে নামাজ পড়তেন ?

৮) –
মহানবী (সাঃ) কি মসজিদে খিফে নামাজ পড়েন নাই !
অথচ রাসূল (সাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে , ঐ মসজিদটি সত্তরজন নবীর দাফনের স্থান ।
এই হাদিসটি আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং তাবরানী তাঁর হাদীস গ্রন্থে তা এনেছেন ।
সূত্র – আল মোজামুল কাবির,৩য় খণ্ড,পৃ. ২০৪ ।

৯) –
মহানবী (সাঃ) কি হযরত ইবরাহীমের (আঃ)কবরের নিকট নামাজ পড়েন নাই ?

আবু হুরাইরা মহানবী (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন , তিনি বলেছেন,‘জীবরাঈল (আঃ) যখন আমাকে মিরাজের রাত্রিতে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যান। তখন হযরত ইবরাহীমের কবরের নিকট নামিয়ে দিয়ে বলেন , হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন । কারন এখানে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) কবর ।
অতঃপর বেথেলহামে নিয়ে যান ও বলেন , হে আল্লাহর নবী (সাঃ) ! এখানেও দুই রাকাত নামাজ পড়ু। কারন আপনার ভ্রাতা ঈসা এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন ।’
সূত্র – সহীহ ইবনে হাব্বান ।

১০) –
ইসলামের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় সবসময় মুসলমানরা চেষ্টা করেছে , আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের নিকট নামাজ পড়া । চিরাচরিত এ সুন্নাতকে জীবিত রাখতে তাদের মাথায় কখনও এ কর্ম হারাম হওয়ার কথা আসে নাই ।
আব্বাসীয় খলীফা মানসুর দাওয়ানেকী একদিন রাসূলের (সাঃ) কবরের নিকট দাঁড়িয়ে মালিকী মাজহাবের প্রবক্তা মালিক ইবনে আনাসকে প্রশ্ন করলেন ,‘ হে আবা আবদুল্লাহ্ ! কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করব , নাকি রাসূলের কবরের দিকে মুখ করে ?

মালিক ইবনে আনাস বললেন ,‘ কেন রাসূলের (সাঃ) দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছ ? জেনে রাখ , তিনি কেয়ামত পর্যন্ত তোমার সহ তোমার পিতা আদমের মুক্তির মাধ্যম । তাই তাঁর দিকে মুখ ফিরাও এবং তাঁকে নিজের জন্য আল্লাহর নিকট শাফায়াতকারী হিসেবে পেশ কর যাতে করে তোমার দোয়া গৃহীত হয় ।’
সূত্র – ওয়াফাউল ওয়াফা,৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৩৭৬ ।

আহলে সুন্নাতের আলেমদের এ সম্পর্কিত ফতোয়া ।

আহলে সুন্নাতের ফিকাহ গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করলে দেখা যায় , তাঁদের সকলেই -ওহাবীরা ব্যতীত- এ বিষয়ে একমত যে , আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের নিকট নামাজ পড়া ও দোয়া করা জায়েয ।
যেমন-

১) – আল মুদাববিনাতুল কুবরা গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে , মালিক ইবনে আনাস কবরসমূহের নিকট নামাজ পড়াতে কোন অসুবিধা আছে বলে মনে করতেন না । যদি নামাজী ব্যক্তি ঐ কবরগুলোর নিকট এমনভাবে নামাজ পড়ে যে , তার সামনে-পেছনে এবং ডানে-বামে কবর রয়েছে । তিনি আরও বলেছেন ,‘ আমি অনেকের নিকটই শুনেছি মহানবীর (সাঃ) সাহাবীরা কবরস্থানের নিকট নামাজ পড়তেন ।’
সূত্র – আল মুদাভভেনাতুল কুবরা ,১ম খণ্ড,পৃ: ৯০ ।

২) – আবদুল গণি নাবলুসী তাঁর‘ আল হাদীকাতুন নাদিয়া’ গ্রন্থে বলেছেন , ‘ যদি কোন ব্যক্তি কোন সৎকর্মশীল বান্দার কবর হতে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর কবরের নিকট নামাজ পড়ে এবং তার ঐ কবরবাসী ব্যক্তির প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের ইচ্ছা ও তাঁর প্রতি মনোযোগ না থাকে , তবে তার নামাজে কোন সমস্যা নাই । কারন মসজিদুল হারামের হাতিমের নিকটে হযরত ইসমাঈলের (আঃ) কবর থাকা সত্বেও সেটি নামাজ পড়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান ।’
সূত্র – আল হাদীকাতুন নাদিয়া,২য় খণ্ড,পৃ. ৬৩১ ।

৩) – খাফফাজী তাঁর‘ শারহুশ শিফা’ গ্রন্থে বলেছেন , ‘ রাসূলের (সাঃ) রওজার.দিকে মুখ করে কাবাকে পিছনে ফেলে দোয়া করা শাফেয়ী মাজহাব ও আহলে সুন্নাতের সকল আলেমের মতেই জায়েয ।
এ বিষয়ে আবু হানিফার মতও তা-ই ।
সূত্র – শারহুশ শিফা,৩য় খণ্ড,পৃ. ৫১৭ ।

৪) – ইবনুল হুমাম হানাফী আলেমদের একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ।
তিনি বলেন , ‘ আবু হানিফা সম্পর্কে যে বলা হয়ে থাকে তিনি রাসূলের (সাঃ) কবরের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করতেন ,তা সঠিক নয় । কারন তা সুন্নাতের পরিপন্থী ।
কেরমানী এ সম্পর্কে বলেছেন,‘ আবু হানিফার মত – কিবলার দিকে দাঁড়িয়ে রাসূলের (সাঃ) কবরকে পিছনে রেখে দোয়া করা গ্রহণযোগ্য নয় । কারন মহানবী (সাঃ) তাঁর রওজায় এখনও জীবিত আছেন এবং তিনি তাঁর জিয়ারতকারীকে চিনেন ।’
সূত্র – শারহুশ শিফা,৩য় খণ্ড,পৃ. ৫১৭ ।

পাঠক ,

এবারে আসুন ওহাবীদের উপস্থাপিত দলীলের পর্যালোচনা ।

ওহাবীরা আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের নিকটে নামাজ পড়া ও দোয়া করা হারাম ও নাজায়েয হওয়ার স্বপক্ষে দুই ধরনের দলীল উপস্থাপন করেছে ।

ক) – নাসিরুদ্দীন আলবানী রাসূল (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন ,‘ কবরের দিকে মুখ করে ও কবরের উপর নামাজ পড়িও না ।’
সূত্র – আল মুজামুল কাবির,৩য় খণ্ড,পৃ. ১৪৫ ।

উত্তর – প্রথমত ওহাবী আলেমগণ শুধু নিজেদের হাদিসকে দিয়ে অন্যদের হাদিসগুলোকে প্রত্যাখ্যানের দলীল বানাতে পারেন না । কারণ বিপরীত পক্ষের হাদিসগুলোও প্রমাণিত ।
এ কারণেই ইবনে হাজাম তাঁর‘ আল ফিসাল’গ্রন্থে বলেছেন,‘ আমরা শীয়াদের আকীদাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করতে আমাদের হাদিসগুলো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি না । কারণ তারা তা গ্রহন করবে না । তেমনি শীয়ারাও তাদের বর্ণিত হাদিসকে আমাদের বিপক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না ।’
সূত্র – আল ফিসাল,৪র্থ খণ্ড,পৃ. ৯৪ ।

দ্বিতীয়ত কোন কোন হাদিসে সুস্পষ্টভাবে কবরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে ও কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করতে (যা তাকে اله বা উপাস্যের পর্যায়ে পৌঁছায়) নিষেধ করা হয়েছে । কারন তা ধর্মের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও শিরকে পর্যবসিত হতে পারে ।
কিন্তু যদি বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তা করা হয় তবে তাতে কোন অসুবিধা নাই ।

বাইদ্বাভী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বলেছেন ,‘ রাসূলের (সাঃ) যুগে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা তাদের নবীদের কবরের প্রতি সম্মান দেখাতে সিজদা করত এবং সেদিকে মুখ করে নামাজ পড়ত। প্রকৃতপক্ষে তারা ঐ কবরগুলোকে মূর্তির ন্যায় সিজদা করত। এ কারণেই রাসূল (সাঃ) তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন ও এরূপ করা হতে মুসলমানদের বিরত থাকতে বলেছেন ।
সূত্র – হাকীকাতুত তাওয়াসসুল ওয়াল ওয়াসিলা,পৃ. ১৪৫ ।

এখন যদি কেউ আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের নিকট তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানো ও তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণের নিয়তে নামাজ না পড়ে বরং তাঁদের কবর হতে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে সেখানে নামাজ পড়ে ও দোয়া করে তবে কি তা শিরক হবে ?
সহজ জবাব – কখনই নয় । কারণ মানুষ ঐ পবিত্র স্থানে এ জন্য নামাজ পড়ে যে , ঐ ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ প্রিয় বান্দা । সে তাওহীদ ও একত্ববাদের ধারক ও প্রচারক । তাই তাঁর কবরের নিকট নামাজ পড়লে নামাজের ক্ষেত্রে অধিকতর মনযোগ ও আল্লাহর প্রতি অধিক নৈকট্য অনুভূত হয় এবং ইখলাস অর্জন করা যায় । তাই এক্ষেত্রে কোন অসুবিধা নাই । বরং তা পছন্দনীয় ।

খ) – শিরকের পথ রোধের মূলনীতি –
ওহাবী আলেমদের কেউ কেউ ,যেমন শেখ আবদুল আজীজ বিন বায উল্লিখিত মূলনীতির ভিত্তিতে বলেছেন ,‘ যেহেতু আল্লাহর ওলীদের কবরের নিকট নামাজ পড়া ও দোয়া করাতে শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাই তা হারাম ও বাতিল বলে গণ্য ।’
সূত্র – ফাতাওয়া নুরুন আলা দারব,১ম খণ্ড,পৃ. ৩০২ ।

উত্তর – উসূলশাস্ত্রের আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে ,হারামে পৌঁছাতে পারে এরূপ সকল মাধ্যমই হারাম নয় । বরং যে মাধ্যম ও কর্ম সরাসরি মানুষকে হারামে ফেলে শুধু তা-ই হারাম ।
নামাজ ও দোয়ার ক্ষেত্রেও যা তাকে সরাসরি ও নিশ্চিতভাবে হারামে ফেলে তা-ই হারাম । কিন্তু যে নামাজ ও দোয়া এরূপ নয় ,তা হারাম নয় । বরং জায়েয ও মুস্তাহাব ।
প্রায় সকল মুসলমানই আল্লাহর প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের কবরের নিকট তাঁদের ইবাদতের উদ্দেশ্যে বা তাঁদের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন -যা তাঁদের উপাস্যের পর্যায়ে পৌঁছায় – করতে সেখানে নামাজ পড়ে না বা দোয়া করে না । বরং তারা কেবল তাঁদের কবর হতে বরকত লাভের উদ্দেশ্যেই তা করে ।

লেখাটির সমাপ্তিতে এসে সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ যে , আমার মত অর্ধশিক্ষিত গন্ড মূর্খ কাঠমোল্লার আজেবাজে ফতোয়া দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে সাধ্যমত জগতের সকল প্রকৃত অলী-আউলিয়াদের পবিত্র মাজার জিয়ারত করুন এবং নিজের মন ও আত্মাকে উজ্জীবিত করুন । ওনাদের ওসিলায় নিজেকে পাপমুক্ত করুন এবং নিজেকে আরও বেশী করে খোদামুখী করুন ।

আজকের মত আলাপের এখানেই সমাপ্তি ।
সকলকে ধন্যবাদ এবং সালাম জানিয়ে বিদায় ।
খোদা-হাফেজ ।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + two =