পবিত্র কাবা গৃহ এবং কারবালা ।

চারিদিকে শুধু বালু আর বালু । বালুর মহাসাগর ।
অতি উতপ্ত মরুভূমি । আশেপাশে হাজার মাইলের মধ্যে লোকবসতির সামান্যতম চিন্হ নেই । এমনকি জীব জানোয়ার চোখে পড়ে না ।

এরকম একটা জনবসতিহীন এলাকার মধ্যে মহান আল্লাহর সরাসরি হুকুমে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহর পবিত্র ঘর বাইতুল্লাহ পুননির্মান করছেন ।
আল্লাহর হুকুম মত হযরত ইব্রাহীম (আঃ) নিবিষ্টমনে পবিত্র ঘর নির্মান করছেন বটে ।
কিন্ত অবচেতন মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল যে , জনবসতিহীন এইরকম একটা আবাদহীন ধুঁ ধুঁ মরুভূমির মাঝখানে আল্লাহর এই পবিত্র ঘরে কেইবা আসবে এবং এইরকম আবাদহীন মরুভূমিতে কেনইবা মহান আল্লাহ ঘর বানাতে বললেন ?

নবীমনের এই কৌতুহল আল্লাহর দৃষ্টি এড়িয়ে গেল না । আল্লাহ তো অন্তর্যামী , সকল বান্দার মনের খবর তিনি সম্পূর্ন অবহিত ।

একপর্যায় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু ইব্রাহীম নবীকে (আঃ) বললেন ,
হে ইব্রাহীম ! আমার নির্দেশমত ঘর তুমি বানাও এবং মানুষকে আহবান কর বা আযান দাও । একসময় দেখবে , দলে দলে মানুষ পদব্রজে ও সুন্দর সুন্দর ঘোড়া বা উটের পিঠে চড়ে এই গৃহের যিয়ারতে আসবে ।

” — এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের ঘোষনা করে দাও , যেন তারা তোমার নিকট পায়ে হেঁটে এবং সব রকমের শীর্নকায় বাহনে করে দূর-দূরান্ত হতে আসে — ” ।
সুরা – হাজ্জ / ২৭ ।

প্রিয় পাঠক ,
আমি জানি না যে , হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ওনার জীব্বদশাতে এই দৃশ্য দেখে যেতে পেরেছিলেন কিনা ?

জ্বী পাঠক ,
বলছিলাম যে , আমাদের সকলের প্রানপ্রিয় মক্কা নগরীতে অবস্থিত পবিত্র কাবা গৃহের কথা । প্রতি বছর সকল সময় পবিত্র কাবা গৃহ বিশ্বের সকল ধর্মপ্রান মুসলমানের যিয়ারতে মুখর থাকে ।
সেই সাথে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু ইব্রাহীমের (আঃ) কুরবানীকে আরেকটি বিশাল বড় পবিত্র কুরবানীর সাথে বদল করেছিলেন ।

পাঠক ,
এবারে আসুন ইতিহাসের আরেক দিকে ।
ঠিক ঐরকম আরেকটি বড় মরু প্রান্তর । চারিদিকে শুধু বালু আর বালু । অতি উতপ্ত মরুভূমি । আশেপাশে কয়েক মাইলের মধ্যে জনবসতির সামান্যতম চিন্হ নাই ।
বেশ কিছু দূরে একটি বড় নদী বয়ে যাচ্ছে । এরপরেও জায়গাটি জনবসতিহীন অনাবাদী পরিত্যক্ত মরুভূমি ।
জায়গাটির আঞ্চলিক নাম হচ্ছে কারবালা ।

হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) মত জনবসতিহীন ধূঁ ধূঁ মরুভুমির ঠিক মাঝখানে মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) তাঁর জীবনের শেষ পদচিন্হ রাখলেন ।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যেমন ওনার পরিবার ও পুত্র নিয়ে মক্কার মরু প্রান্তরে আবাস গড়েছিলেন ।
ঠিক সেভাবেই এই কারবালাতেও মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) তাঁর শিশুপুত্র , পত্মী , ভাইবোন সহ সঙ্গী সাথী নিয়ে আবাস গড়লেন ।
এরপরের করুন নির্মম ইতিহাস সকলের জানা আছে ।

দশই মহররম পড়ন্ত বিকালে মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) বিশ্বের সমগ্র মানবজাতিকে আহবান করেছিলেন –
‘হাল্ মিন্ নাস্রিন ইয়ানসুরুনা ?”
অর্থাৎ –
‘আমাদের সাহায্য করার মত কি তোমাদের মাঝে একজনও নাই ?

ঠিক যেমন করে ইব্রাহীম (আঃ) পবিত্র কাবা ঘরের যিয়ারতের জন্য বিশ্বের সমগ্র মানবজাতিকে আহবান করেছিলেন ।

পাঠক ,
খেয়াল করুন , প্রতি বছর লক্ষ কোটি কোটি মুমিন ভক্তকুলের যিয়ারতে কারবালা প্রান্তর মুখরিত হয়ে থাকে ।
এক সময়ের জনবসতিহীন আবাদহীন কাবা গৃহ এখন বিশ্বের সকল মুসলমানের যিয়ারতে মুখরিত থাকে ।
ঠিক তেমনি এক সময়ের জনবসতিহীন কারবালা প্রান্তর বিশ্বের সকল মুমিনের যিয়ারতে মুখরিত থাকে ।

এখানে একটি পার্থক্য আছে । সেটা জেনে নিন ।
বহু মুনাফিক মুসলমান পবিত্র কাবা গৃহের যিয়ারতে যায় ।

কিন্ত হায় আমার কারবালা !
শুনলে আপনি অবাক হবেন যে , অপবিত্র আত্মার অধিকারী কোন মানুষ শত চেষ্টাতেও পবিত্র কারবালা যিয়ারত করতে পারে না । আজ পর্যন্ত কোন মুনাফিক কারবালা যিয়ারত করতে পারে নাই । মাওলার (আঃ) অনুমতিক্রমে বিশুদ্ব আত্মার অধিকারী শুধুমাত্র মুমিন বান্দাগন কারবালা যিয়ারত করতে পারে ।

পাঠক ,
এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় না বললেই নয় ।
সেটা হল যে , বিশাল হস্তীবাহিনী এবং কুলাঙ্গার ঈয়াযীদের সৈন্যবাহিনী পবিত্র কাবাগৃহ ধ্বংস করতে চেয়েছিল । ধ্বংস তো করতে পারেনি , পরিনামে ওরাই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিন্হ হয়ে গিয়েছে ।
একই ভাবে উমাইয়া থেকে শুরু করে আব্বাসীয় বাদশাগন এবং সর্বশেষ ইরাকের প্রয়াত বাদশাহ সাদ্দাম সাহেবও কারবালা ধ্বংস করতে চেয়েছিল । পরিনামে কোথায় আজ তারা !

এজন্যে আল্লাহ বলেন যে , ওরা তো ফুৎকারে সত্যের শিখা নিভিয়ে দিতে চায় । কিন্ত আল্লাহ সে শিখা উজ্জীবিত রাখতে চান । যদিও সেটা কাফের মুশরিকরা কিছুতেই পছন্দ করে না ।

” — তারা আল্লাহর জ্যোতিকে ফু দিয়ে নিভিয়ে ফেলতে চায় । কিন্ত আল্লাহ তাঁর জ্যোতি পূর্ন করবেনই , যদিও অবিশ্বাসীরা তা অপছন্দ করে — ” ।
সুরা – সাফফ / ৮ ।

হায় কারবালা !
হায় আমার মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) ।

 

শেয়ার করুন